ইরানে চলমান সরকারবিরোধী প্রতিবাদ এবং নিরাপত্তা অবস্থা তেলের সরবরাহের সম্ভাব্য বিঘ্নের ইঙ্গিত দেয়, যা আন্তর্জাতিক তেল বাজারে তেলের দামের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী তেল ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, বিশেষ করে প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর ক্ষেত্রে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রোয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম এক ডলারের দশমিক ছয় সেন্ট (১.০৬ $) বাড়ে, ফলে ব্যারেলপ্রতি ৬৪.৯৩ ডলার পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি গত মধ্য নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে এবং বাজারে তীব্র অস্থিরতা নির্দেশ করে।
ইউনাইটেড স্টেটসের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও একই রকম প্রবণতা দেখিয়েছে; ব্যারেলপ্রতি এক ডলারের দশমিক দুই সেন্ট (১.০২ $) বাড়ে, ফলে দাম ৬০.৫২ ডলারে স্থিত হয়েছে। উভয় সূচকের প্রায় ১.৭ % বৃদ্ধি সরবরাহ উদ্বেগের সরাসরি প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ইরান ওপেকের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা সমস্যাগুলি সরবরাহের ওপর ঝুঁকি তৈরি করছে। এই ঝুঁকি বাজারে তেলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, যদিও সরাসরি উৎপাদন বন্ধের তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের অস্থিরতা তেলের দামের ওপর প্রায় ৩০৪ ডলার জিও‑পলিটিক্যাল রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ করেছে। এই প্রিমিয়াম বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনা করে দামের সাময়িক উত্থানকে ব্যাখ্যা করে।
ইরান তার তেলের বড় অংশ চীনসহ বিভিন্ন এশীয় ও ইউরোপীয় দেশে রপ্তানি করে। তাই ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চীনসহ প্রধান ক্রেতাদের সরবরাহ চেইনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, যা গ্লোবাল তেল বাজারে অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা যোগ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের হুমকি, যা ইরানের তেল রপ্তানিকে সীমাবদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, তেল বাজারে অতিরিক্ত উদ্বেগের সঞ্চার ঘটিয়েছে। যদিও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর হয়নি, তবে সম্ভাব্য নীতি পরিবর্তন বাজারে সতর্কতা বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপসারণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন প্রায় ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
এই পরিকল্পনা তেল বাজারে বিকল্প সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা সরবরাহের বাস্তবায়নকে অনিশ্চিত রাখে। ফলে বাজারে এই বিকল্পের প্রভাব সীমিত রয়ে গেছে এবং ইরানের সরবরাহ ঝুঁকিকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য সরবরাহ উভয়ই তেল বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। তেল দামের সাম্প্রতিক উত্থান এই দুই দেশের পরিস্থিতির সমন্বয় ফলাফল হিসেবে দেখা যায়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ইরানের বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল সরবরাহে আরও বড় বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা দামের আরও উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলার সরবরাহের অগ্রগতি যদি বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কিছুটা চাপ কমাতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকি দূর করবে না।
বাজারের বর্তমান প্রবণতা নির্দেশ করে যে, তেল দামের ওপর জিও‑পলিটিক্যাল রিস্কের প্রভাব বাড়ছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তেল ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই সরবরাহ চেইনের সম্ভাব্য বিঘ্নের জন্য বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।
সংক্ষেপে, ইরানের বিক্ষোভ এবং ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য সরবরাহ উভয়ই আন্তর্জাতিক তেল বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ভবিষ্যতে সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং জিও‑পলিটিক্যাল রিস্কের পরিবর্তন তেলের দামের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



