চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবনেরগর উপজেলায় এক বিশেষ অভিযানের সময় ৫৫ বছর বয়সী শামসুজ্জামান ডাবলু, স্থানীয় বিএনপি শাখার সাধারণ সম্পাদক, আটক হওয়ার পর হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় মারা যান। ঘটনাটি ঘটার পর সামরিক বাহিনীর উচ্চতর কর্মকর্তারা অভিযানে জড়িত সকল সৈন্যকে সাময়িকভাবে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টার-সার্ভিস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে প্রকাশ করে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা বা মৃত্যুর অনুমোদন না থাকার কথা জোর দিয়ে বলেন।
সোমবার রাত প্রায় ১০:৩০ টায় জীবনেরগর উপজেলায় অবৈধ অস্ত্রের সন্ধানে গৃহীত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী একটি অভিযান চালায়। অভিযানের অংশ হিসেবে শামসুজ্জামানকে তার নিজস্ব ওষুধের দোকান, হাফিজা ফার্মেসি, থেকে আটক করা হয়। পরে তাকে উপজেলায় অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা শামসুজ্জামানকে রাত ১১:৩০ টায় অচেতন অবস্থায় পেয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যু সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনের মধ্যে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ শুরু হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থাকা ফটকে বিএনপি কর্মীরা বাধা সৃষ্টি করে এবং সৈন্যদের প্রবেশে বাধা দেয়। প্রতিবাদকারীরা হাসপাতালের সামনে আগুন জ্বালিয়ে শামসুজ্জামানের মৃত্যুর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের শাস্তি দাবী করে স্লোগান শোনায়।
আইএসপিআরের প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযানের সময় ফার্মেসি থেকে একটি ৯ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়। তবে শামসুজ্জামানকে আটক করার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হওয়ায় তাকে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা সেবা গ্রহণের পরেও তার অবস্থা উন্নত না হয়ে রাত ১২:২৫ টায় তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
আইএসপিআর জানায়, অভিযানের সময় কোনো অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বা হিংসাত্মক কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং শামসুজ্জামানের মৃত্যু কোনোভাবে পরিকল্পিত নয়। তদুপরি, অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল সেনা সদস্যকে সাময়িকভাবে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে যাতে পরিস্থিতি শীতল হয় এবং তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সময় নিশ্চিত হয়।
স্থানীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা দপ্তর শামসুজ্জামানের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্তের অধীনে মৃতের দেহের অটোপসি, ফোরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সকল সাক্ষীর বিবৃতি সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া, অভিযানের সময় গৃহীত গোয়েন্দা তথ্যের সঠিকতা ও প্রমাণের বৈধতা যাচাই করার জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে।
বিএনপি শাখার কর্মকর্তারা শামসুজ্জামানের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কঠোর তদন্তের দাবি জানায়। তারা উল্লেখ করেন, শামসুজ্জামান স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং তার মৃত্যু স্বাভাবিক শর্তে ঘটেনি। একই সঙ্গে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, শামসুজ্জামানের মৃত্যুর পর স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সাময়িক ঘাঁটি স্থাপন।
আইএসপিআরের বিবৃতি অনুসারে, অভিযানের সময় প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান করা হয়েছিল, তবে শামসুজ্জামানের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি কোনো অস্ত্রের ব্যবহার যুক্ত নয়। তাই, এই ঘটনার জন্য কোনো আইনগত দায়িত্ব নির্ধারণের আগে সম্পূর্ণ তদন্তের ফলাফল অপেক্ষা করা হবে।
বিএনপি নেতার মৃত্যুর পরবর্তী আদালত বা তদন্তের সময়সূচি এখনো সরকারীভাবে প্রকাশিত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দ্রুত তথ্য প্রকাশের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ঘটনাটির স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য তীব্র নজরদারি বজায় রাখবে বলে জানিয়েছে।



