ইরানের তেহরান শহরে ৮ জানুয়ারি সরকারবিরোধী প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার সময় ২৩ বছর বয়সী রুবিনা আমিনিয়ানকে কাছ থেকে গুলি করা হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। রুবিনা তেহরানের শারিয়াতি কলেজে টেক্সটাইল ও ফ্যাশন ডিজাইন অধ্যয়নরত কুর্দি শিক্ষার্থী ছিলেন। মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের মতে, গুলি সরাসরি তার মাথায় আঘাত করে, ফলে সে তৎক্ষণাৎ প্রাণ হারায়।
রুবিনার পরিবার জানায়, তার দেহ কেরমানশাহে শনাক্ত করার পর বহু জটিলতা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত কেরমানশাহে ফেরত আনা হয়। তবে দেহ পৌঁছানোর পর গোয়েন্দা বাহিনীর উপস্থিতি এবং দাফনের অনুমতি না দেওয়ার কারণে পরিবারকে দেহকে পার্শ্ববর্তী কামিয়ারান শহরের সড়কের পাশে সমাধিস্থ করতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনাটি ইরানে চলমান বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান হিউম্যান রাইটসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রুবিনার পরিবার এবং ঘটনাস্থলের সরাসরি সাক্ষীদের তথ্য অনুযায়ী, গুলি মারিভান শহরের বাসিন্দা কুর্দি তরুণীকে পেছন থেকে লক্ষ্য করে করা হয়। গুলিটি সরাসরি তার মাথায় আঘাত করে, ফলে রুবিনা গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই মারা যায়। সংস্থাটি জানায়, রুবিনার পরিবার কেরমানশাহে দেহ শনাক্ত করার পর দেহকে শহরে ফেরত আনার অনুমতি পায়, তবে দাফনের অনুমতি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী সড়কের পাশে সমাধিস্থ করতে বাধ্য হয়।
রুবিনার চাচা নেজার মিনুইই তার বোনের চরিত্র বর্ণনা করে বলেন, রুবিনা শক্তিশালী মনের, সাহসী এবং স্বাধীনতা ও নারীর অধিকার নিয়ে তীব্রভাবে উত্সাহী ছিলেন। তিনি তার মতামত ও বিশ্বাসের জন্য লড়াই করতেন এবং তার সিদ্ধান্তে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারত না। এই বিবরণগুলো পরিবারিক সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং রুবিনার ব্যক্তিত্বের একটি স্বতন্ত্র চিত্র তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি অনুসারে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৩৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৯০ জনই প্রতিবাদকারী। একই সময়ে ১০,৬০০ এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যা সরকারবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়ার পরিসরকে নির্দেশ করে।
সরকারি সূত্র থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল এবং গুলির উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রদান করেননি। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনার উপর নজর রাখছে এবং ইরানের বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার করা গুলির প্রকৃতি এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। রুবিনার ক্ষেত্রে গুলি সরাসরি মাথায় আঘাত করা হয়েছে, যা গুলিবিদ্ধের তাত্ক্ষণিক মৃত্যুর কারণ। এই ধরনের সরাসরি গুলিবিদ্ধের পদ্ধতি নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ইঙ্গিত দেয়।
ইরানের বিচার বিভাগে এই ঘটনার তদন্তের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেহের পুনরুদ্ধার এবং দাফনের অনুমতি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের লড়াই করেছে, যা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে আরও তীব্র করেছে।
রুবিনার মৃত্যু ইরানের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীনতা, নারীর অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য লড়াই করা ব্যক্তিদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার পরিবার এবং সমর্থকরা তার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে, একই সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ন্যায়বিচার দাবি করে চলেছেন।
এই ঘটনার পর ইরানের সরকারবিরোধী প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ বাড়বে বলে আশা করা যায়। রুবিনার কেসের ফলাফল ভবিষ্যতে ইরানের বিচারিক ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।



