ইরানের চলমান বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনের প্রেক্ষাপটে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরানের সরকার শীঘ্রই শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে মন্তব্য করেছেন। মের্ৎসের এই মন্তব্যটি মঙ্গলবার ভারত সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত হয়। তিনি ইরানের বর্তমান শাসনকে কেবল বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে চিহ্নিত করে, তার অবসানকে অনিবার্য বলে উল্লেখ করেন।
মের্ৎসের মতে, তেহরানের শাসনব্যবস্থা যদি শুধুমাত্র সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা বজায় রাখতে চায়, তবে তার সমাপ্তি স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে। তিনি বলেন, “যেকোনও সরকার যদি কেবল সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, তাহলে কার্যত তার পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। আমার ধারণা, আমরা এখন এই শাসনব্যবস্থার শেষ কয়েকটি দিন ও সপ্তাহ প্রত্যক্ষ করছি।” এই বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ইরানে গত কয়েক মাসে ব্যাপক প্রতিবাদ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। শহর-শহরে সশস্ত্র গুলিবর্ষণ, আটক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরে এসেছে। এই পরিস্থিতি তেহরানের শাসনকে জনমত ও আন্তর্জাতিক সমর্থন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, যা মের্ৎসের মন্তব্যের পটভূমি গঠন করে।
মের্ৎস ইরানের নেতৃত্বের জনসাধারণের বৈধ সমর্থন হারিয়ে ফেলেছে বলে উল্লেখ করে, একই সঙ্গে তিনি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের ভবিষ্যতে একটি গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ সরকার গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রয়োজন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখছে।
বার্লিনে মের্ৎসের দল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য এই দেশগুলোর কূটনৈতিক সংলাপ নিবিড়ভাবে চলছে। এই সমন্বয় ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সমাধানে বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বর্তমান সংকটের সমাধানে কূটনীতিকে প্রথম পছন্দ হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছে। হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এবং বিমান হামলা সহ অন্যান্য সামরিক বিকল্পগুলো এখনও বিবেচনায় রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের মতে, “কূটনীতি সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ, তবে সামরিক হামলার অপশনটিও ‘টেবিলে আছে’।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখার কথা উল্লেখ করে, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি প্রকাশ করেছেন। এই মন্তব্য ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে তীব্র করেছে।
বিশ্লেষকরা ইরানের শাসনব্যবস্থার দ্রুত পতন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। যদি ইরানের সরকার সত্যিই শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে শাসন পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সমর্থন এবং সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া, ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদকারীদের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার চাপও রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতি নির্ধারণে মূল উপাদান হবে।
সারসংক্ষেপে, জার্মান চ্যান্সেলরের ইরানের শাসনের দ্রুত পতনের পূর্বাভাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্পের সম্ভাবনা ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের সমন্বয়ই আগামী সপ্তাহে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কীভাবে সমাধান হবে তা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



