ঢাকা—বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৩ জানুয়ারি মিয়ানমার দূত ইউ ক্যাও সো মোকে ডেকে টেকনাফের হুইকং ইউনিয়নের নিকটবর্তী সীমান্তে গুলিবর্ষণ ঘটার ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুলিবর্ষণটি সরাসরি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গুলি পড়ার ফলে ১২ বছর বয়সী এক মেয়ের শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকারকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধে তৎপরতা দেখাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
দূতকে ডেকার সময়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, সীমান্তে অনধিকৃত গুলিবর্ষণ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য গুরুতর হুমকি। তারা জোর দিয়ে বলেন, এমন কোনো কাজ যা প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা ও শান্তিকে ক্ষুণ্ন করে, তা কোনো শর্তে গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনাস্থল হুইকং ইউনিয়ন, টেকনাফ, কক্সবাজারের নিকটবর্তী এলাকা, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের খবর শোনা যায়। সূত্র অনুযায়ী, গুলিবর্ষণটি উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পৌঁছেছে, যার ফলে ১২ বছর বয়সী মেয়েটি গুলির আঘাতে আহত হয়। তার পরিবারকে জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, অনধিকৃত গুলিবর্ষণ কেবল মানবিক দিক থেকে নয়, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও অনুচিত। তারা রেফারেন্স হিসেবে ১৯৪৯ সালের হ্যাগ কনভেনশন এবং ১৯৯৯ সালের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে উল্লেখ করে, যেগুলোতে সীমান্ত পারাপার গুলিবর্ষণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের লঙ্ঘন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি ক্ষয় করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সীমান্তে সংঘটিত যেকোনো সামরিক কার্যকলাপের জন্য মিয়ানমারকে পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে এবং তা পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া, মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে যে, দেশের অভ্যন্তরে গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যে কোনো সংঘাতের ফলাফল বাংলাদেশের নাগরিকের জীবন ও জীবিকার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
মিয়ানমার দূত ইউ ক্যাও সো মো এই দাবিগুলোকে স্বীকার করে, তার সরকারকে দ্রুত এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আহত মেয়ের পরিবারকে আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সীমান্ত রক্ষার জন্য অতিরিক্ত নজরদারি বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেন।
এই ঘটনার পটভূমিতে, পূর্বে একই সীমান্তে অনুরূপ গুলিবর্ষণ ও শরণার্থী প্রবাহের ঘটনা ঘটেছে, যা দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোও এই ধরনের সীমান্ত লঙ্ঘনকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে, এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে অনিচ্ছাকৃত গুলিবর্ষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা ইঙ্গিত করেন, যদি দুই দেশ দ্রুত সমন্বয় না করে, তবে এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, উভয় পক্ষের জন্য সীমান্ত রক্ষার জন্য যৌথ নজরদারি ব্যবস্থা এবং তথ্য শেয়ারিং প্রোটোকল গড়ে তোলা জরুরি।
পরবর্তী সপ্তাহে, দু’দেশের কূটনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী বিষয় এবং গুলিবর্ষণ রোধের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা যায়। এই আলোচনার ফলাফল কেবল দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



