মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিগ্যাল সেল ২৫ জন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ দাখিল করেছে। অভিযোগের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ. রহমানসহ আরও ২৪ জন ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত, যারা জুলাই ২০২৪-এ চলমান প্রতিবাদে সরকারের প্রতি উন্মুক্ত সমর্থন প্রকাশ করেছিল। লিগ্যাল সেলের সম্পাদক মোতাসিম বিল্লাহ মাহফুজ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিগ্যাল সেল, যা আন্দোলনের আইনি কার্যক্রম সমন্বয় করে, গত সপ্তাহে একটি বিশদ অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে ট্রাইব্যুনালের কাছে উপস্থাপন করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, উক্ত ব্যবসায়ীরা ২২ জুলাই ২০২৪-এ প্রধানমন্ত্রী অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরাসরি শেখ হাসিনার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে সরকারের নীতি ও কর্মসূচিকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ঐ সভার আয়োজক ও সঞ্চালক হিসেবে সালমান এফ. রহমান উপস্থিত ছিলেন, যা তাকে সরকারের নিকটস্থ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মোতাসিম বিল্লাহ মাহফুজ প্রসিকিউশনের কাছে তৎক্ষণাৎ তদন্তের নির্দেশনা দেন এবং অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে চার্জশিট প্রণয়নের দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমরা তদন্তকারী সংস্থাকে এখনই প্রসিকিউশনে জানিয়েছি, যাতে আজকের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথি পাঠিয়ে দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা যায়।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, লিগ্যাল সেল দ্রুত আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে উক্ত ব্যবসায়ীদের উপর দায়িত্ব আরোপ করতে চায়।
অভিযোগের মধ্যে আরেকজন মুখ্য বক্তা রিফাতের মন্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। রিফাত উল্লেখ করেন, “এই আওয়ামী টাকায় এখনো আমার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আর আমার বোনদেরকে অনলাইনে হ্যারাসমেন্ট করা হয়, যা তাদের আত্মহত্যার দিকে ধাক্কা দিচ্ছে।” তিনি অতিরিক্তভাবে বলেন, “৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা সাধারণ জনগণকে সহিংসতা না করার এবং রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছি।” রিফাতের বক্তব্য আন্দোলনের নীতি ও লক্ষ্যকে পুনর্ব্যক্ত করে, যা সরকারবিরোধী নয় বরং দেশের স্বার্থ রক্ষার দিকে মনোযোগী।
অভিযোগ দাখিলের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম, লিগ্যাল সেলের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, নারী সেলের সম্পাদক নূপুর আক্তার নোভা, এবং ইশতিয়াক হোসেনসহ কয়েকজন সদস্য সমাবেশে অংশ নেন। তাদের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, এই আইনি পদক্ষেপটি আন্দোলনের সমগ্র কাঠামোর সমর্থন পেয়েছে এবং একক ব্যক্তির উদ্যোগ নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব হল মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের তদন্ত করা। যদিও ব্যবসায়ীদের সমর্থন প্রকাশকে সরাসরি আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় আনা যায় না, তবে লিগ্যাল সেল দাবি করে যে, এই সমর্থনটি সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে দমন করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যা মৌলিক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা তৈরি করে। ট্রাইব্যুনাল এখনো এই অভিযোগের গৃহীতির সিদ্ধান্ত দেবে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে তদন্তের নির্দেশনা ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে।
এই আইনি পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। সরকার যদি এই অভিযোগকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন, তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে সমালোচনা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি ট্রাইব্যুনাল দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে চার্জশিট প্রণয়ন করে, তবে এটি সরকারের সমর্থক ব্যবসায়ীদের ওপর আইনি চাপ বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমর্থনের প্রকাশে সতর্কতা সৃষ্টি করবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই অভিযোগকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য—সরকারের নীতি ও কর্মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—এর অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আন্দোলনের নেতৃত্বের মতে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত উক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের রিলিফ বা সুরক্ষা প্রদান করা যাবে না। ভবিষ্যতে আদালতের রায় ও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে, বিশেষত সরকার-বিরোধী প্রতিবাদ ও সমর্থন প্রকাশের ক্ষেত্রে।



