আইন মন্ত্রণালয় এক বছরের বেশি সময় ধরে অকার্যকর অবস্থায় থাকা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের শীর্ষ পদ পূরণে একটি বাছাই কমিটি গঠন করেছে। কমিটি গঠন সংক্রান্ত আদেশ সোমবার প্রকাশিত হয় এবং এতে নতুন চেয়ারপার্সন ও কমিশনার নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কমিটি গঠন করা হয়েছে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুসারে এবং এর সভাপতি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি কমিটির নেতৃত্বে সদস্যদের নির্বাচন প্রক্রিয়া তদারকি করবেন।
কমিটির সদস্যদের তালিকায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কুবলেশ্বর ত্রিপুরা এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাংবাদিক অন্তর্ভুক্ত। এই বহুমুখী গঠন কমিটিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে।
কমিটিকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করা হবে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে। এই সহায়তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে ব্যাপক রদবদল ঘটেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পর, ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর, পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ করা ব্যক্তিরা একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে নতুন নিয়োগ না হওয়ায় কমিশন কার্যকরী স্তরে কাজ করতে পারেনি।
চেয়ারম্যান ও কমিশনারের অনুপস্থিতিতে কমিশনের কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে এক হাজারের বেশি অভিযোগ সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতা, নিখোঁজ, গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং বিনা বিচারে আটক সংক্রান্ত অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। এই অভিযোগগুলোর সমাধান না হওয়া মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ফাঁক তৈরি করেছে।
সরকার গত ডিসেম্বরে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। সংশোধনে নতুনভাবে ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ’ গঠন, স্বাধীন বাজেটের ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাবঞ্চিত ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য বিস্তৃত ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো কমিশনের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে মানবাধিকার রক্ষায় আরও শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্য বহন করে।
কমিটির গঠন এবং সংশোধিত অধ্যাদেশের বাস্তবায়ন একসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন চেয়ারপার্সন ও কমিশনারের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, অভিযোগ নিষ্পত্তি দ্রুততর হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, মানবাধিকার কমিশনের পুনর্গঠন দেশের আন্তর্জাতিক চিত্র উন্নত করবে এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা পূরণে সহায়তা করবে। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, অভিযোগের ব্যাকলগ বাড়তে পারে এবং জনসাধারণের আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
অধিকন্তু, নতুন কমিশনের গঠন ও ক্ষমতা বৃদ্ধি দেশের আইনি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-নিয়ম তৈরি করতে সহায়তা করবে। সরকার যদি নির্বাচিত কমিটি এবং সংশোধিত অধ্যাদেশের ধারাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিক্রিয়া সম্ভব হবে।
এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হবে কমিটির দ্বারা প্রার্থীদের মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার এবং চূড়ান্ত নির্বাচন। নির্বাচিত ব্যক্তিরা শীঘ্রই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করবে এবং দীর্ঘদিনের অভিযোগের সমাধানে অগ্রসর হবে।



