করবর্ষের বর্তমান সময়ে সকল করদাতাকে অনলাইন রিটার্ন দাখিল করতে বাধ্য করা হয়েছে; তবে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী, শারীরিকভাবে অক্ষম, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধির মাধ্যমে দাখিল করা ব্যক্তিদের জন্য এই নিয়মে ছাড় রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রেও অনলাইন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল রাখা হয়েছে, তবে তারা চাইলে ই-রিটার্ন দাখিলের সুবিধা নিতে পারবেন।
করদাতার অনুমোদিত প্রতিনিধি এই বছর অনলাইন মাধ্যমে ই-রিটার্ন জমা দিতে পারবে, যা পূর্বে কাগজপত্রের মাধ্যমে করা হতো। ফলে প্রতিনিধিরা সরাসরি নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে রিটার্ন ফর্ম পূরণ ও জমা দিতে সক্ষম, যা সময় ও শ্রমের সাশ্রয় ঘটায়।
বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, তারা পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য দিয়ে দেশের সীমানা ছাড়াই ই-রিটার্ন দাখিল করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো নথি আপলোডের প্রয়োজন নেই, ফলে ডকুমেন্ট সংগ্রহের ঝামেলা দূর হয়।
করদাতারা ব্যাংকিং সেবা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যাটফর্ম অথবা অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি আয়কর পরিশোধ করতে পারে; পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-রিটার্ন দাখিলের স্বীকারপত্র ই-মেইলে প্রাপ্ত হয়। এই স্বয়ংক্রিয় রসিদ ব্যবস্থা রিটার্নের স্বচ্ছতা বাড়ায় এবং করদাতার জন্য রেকর্ড সংরক্ষণ সহজ করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই নতুন সিস্টেমের ব্যবহারকারীদের সহায়তার জন্য একটি কল সেন্টার চালু করেছে। ০৯৬৪৩৭১৭১৭১ নম্বরে ফোন করলে ই-রিটার্ন সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়, পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চলে স্থাপিত হেল্প‑ডেস্ক থেকেও সহায়তা নেওয়া সম্ভব।
এই করবর্ষে শনিবার পর্যন্ত মোট ২৮ লক্ষ ৮৫ হাজারের বেশি করদাতা তাদের রিটার্ন অনলাইনে দাখিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই সংখ্যা দেখায় যে ডিজিটাল রিটার্ন পদ্ধতি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং করদাতার স্বয়ংক্রিয় রসিদ প্রাপ্তি তাদের সন্তুষ্টি বাড়িয়েছে।
গত বছর কিছু ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর জন্য রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল; তবে নির্ধারিত সময়ের পরেও জরিমানা আরোপের মাধ্যমে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। দেরি করে দাখিল করলে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী মাসিক দুই শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ প্রদান করতে হবে।
বিলম্ব সুদ ছাড়াও, দেরি ফাইলের ফলে কর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটবে; করদাতাকে মোট আয়ের ওপর কর পরিশোধ করতে হবে এবং পূর্বে প্রযোজ্য কর রেয়াত বা অব্যাহতিপ্রাপ্তি আর পাওয়া যাবে না। এছাড়া মাসের হিসাবের ক্ষেত্রে ভগ্নাংশ মাসকে পূর্ণ মাস হিসেবে গণ্য করা হবে, যা মোট করের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই নতুন নিয়মাবলী ব্যবসা ও আর্থিক বাজারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, অনলাইন পেমেন্টের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, ফলে ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবার লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে এবং তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, করদাতার স্বয়ংক্রিয় রসিদ ও রিটার্ন স্বীকৃতি সিস্টেমের মাধ্যমে ডেটা বিশ্লেষণ সহজ হবে, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য বাস্তব সময়ে কর সংগ্রহের প্রবণতা পর্যবেক্ষণকে সক্ষম করবে। তৃতীয়ত, দেরি ফাইলের জন্য আরোপিত জরিমানা ও সুদ সরকারের অতিরিক্ত রাজস্বের উৎস হিসেবে কাজ করবে, যা বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল রিটার্নের ব্যাপক গ্রহণের ফলে ফিনটেক কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সেবা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে; উদাহরণস্বরূপ, রিটার্ন ফিলিং অ্যাপ, স্বয়ংক্রিয় ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন এবং রিয়েল‑টাইম পেমেন্ট ট্র্যাকিং সলিউশনগুলোর চাহিদা বাড়বে। এই সেবাগুলো করদাতার জন্য প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করবে এবং একই সঙ্গে বাজারে নতুন ব্যবসায়িক মডেলকে উত্সাহিত করবে।
অন্যদিকে, দেরি ফাইলের শর্ত ও সুদের হার সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা করদাতাদের জন্য আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসা ও স্বনিয়োজিত কর্মী যারা নগদ প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, তারা বিলম্ব সুদ ও অতিরিক্ত করের বোঝা সামলাতে কঠিন হতে পারে। তাই এনবিআর কর্তৃক চালু করা হেল্প‑ডেস্ক ও কল সেন্টার এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সারসংক্ষেপে, অনলাইন রিটার্ন দাখিলের বাধ্যতামূলকতা ও সংশ্লিষ্ট ছাড়ের ব্যবস্থা কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াচ্ছে, একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক সেক্টরের বিকাশকে ত্বরান্বিত করছে। তবে দেরি ফাইলের শর্ত ও সুদের প্রয়োগের ফলে করদাতার আর্থিক পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে, যা যথাযথ সচেতনতা ও সহায়তা সেবার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।



