ঢাকা, ২০২৬ – দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্ট ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই শিক্ষার্থীদের চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ রাখে, যা সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাধারার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এই বক্তব্যটি মঙ্গলবার রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা–২০২৬’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শোনা যায়।
ড. ইউনূসের মতে, শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থান অর্জনের সরঞ্জাম হিসেবে দেখা হলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার মূল দায়িত্ব হল মানুষের সৃজনশীলতা জাগ্রত করা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা প্রদান করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে শুধুমাত্র চাকরি অনুসন্ধানকারী নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সক্ষমতা সম্পন্ন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
উদাহরণস্বরূপ, তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার মডেল চালু হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে দলগত কাজের মাধ্যমে নতুন পণ্য বা সেবা তৈরি করে। এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের কল্পনাশক্তি ও ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাবকে উত্সাহিত করে, যা ভবিষ্যতে স্টার্ট‑আপ প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান শিল্পে উদ্ভাবনী পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে, তিনি উল্লেখ করেন যে শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে তারা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আত্মবিশ্বাস অর্জন করে, যা চাকরি পাওয়ার চেয়ে বেশি মূল্যবান।
ড. ইউনূস দক্ষিণ এশিয়াকে একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করেন, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বিভাজন এবং অপ্রতুল নীতির কারণে এই সম্ভাবনা প্রায়শই কাজে লাগানো যায় না। তিনি বলেন, শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করা সম্ভব, যদি নীতি নির্ধারকরা সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলেন। উদাহরণস্বরূপ, নীতি স্তরে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা হলে শিক্ষার গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
বক্তব্যের সময় তিনি উল্লেখ করেন, সৃজনশীলতা জন্মগত এবং সঠিক পরিবেশে তা বিকশিত হয়। তবে বর্তমান পাঠ্যক্রমের অধিকাংশই জ্ঞানগত দক্ষতার ওপর কেন্দ্রীভূত, যা শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তা ও নতুন ধারণা গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি প্রস্তাব করেন, পাঠ্যক্রমে শিল্পকলা, ডিজাইন থিংকিং এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার সমাধান করতে পারে।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই রূপান্তরকে বাস্তবায়নের জন্য ড. ইউনূস কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের পরামর্শ দেন। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল আউটপুটকে মূল মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। তৃতীয়ত, সরকারী নীতি নির্ধারকদের উচিত গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য কর সুবিধা ও অনুদান প্রদান করা, যাতে তরুণ উদ্যোক্তারা আর্থিক বাধা ছাড়াই তাদের ধারণা বাস্তবায়ন করতে পারে।
এই আলোচনার শেষে ড. ইউনূস শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি শুধুমাত্র চাকরি পাওয়ার জন্যই শিক্ষা গ্রহণ করছেন, নাকি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য নতুন কিছু সৃষ্টির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন?” তিনি শেষ করেন, “শিক্ষা যদি সত্যিই সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাকে সমর্থন করে, তবে এটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: ১) আপনার পড়াশোনায় প্রকল্পভিত্তিক কাজ যুক্ত করুন, যাতে তত্ত্বের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। ২) বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের উদ্যোক্তা ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন এবং নতুন আইডিয়া শেয়ার করুন। ৩) নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রের উপর ছোট গবেষণা বা পাইলট প্রকল্প চালিয়ে দেখুন, যা ভবিষ্যতে বড় উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে। এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে শিক্ষার ফলাফল শুধুমাত্র চাকরি নয়, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের শক্তি হয়ে উঠবে।



