আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রবাসী থেকে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সে তীব্র বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম এগারো দিনে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেকর্ড করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারেরও উপরে পৌঁছেছে এবং বর্তমান মাসের গড়ের চেয়েও বেশি প্রবাহিত হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে স্থিত হয়েছে। এই পরিমাণে সাম্প্রতিক এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসি.ইউ.) বিল পরিশোধের প্রভাব রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাসে ১৫৩ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর পিএমভি‑৬ পদ্ধতি অনুসারে রিজার্ভের সমন্বিত মূল্য ২৭ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার।
বহু ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, বাড়তি রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা বেশি, সেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ তীব্র। ফলে প্রার্থীরা বিদেশে তহবিল সংগ্রহ করে, যা প্রবাসী আয়ের নামে দেশে প্রবাহিত হচ্ছে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এবং রমজান মাসের সঙ্গে মিলিয়ে মার্চ পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয় ৩,২৮২ কোটি ডলার হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের সমান পরিমাণ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোতে মার্কিন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে; গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছে। ডলার ক্রয়ের গড় মূল্য ১২২ টাকা ৩০ পয়সা, যা বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ৩৮৩ কোটি ডলার ক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়ে একক মাসে প্রায় ৭০ কোটি ডলার ক্রয় করা হয়েছে।
রিজার্ভের ঐতিহাসিক প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে শীর্ষে পৌঁছেছিল, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে রিজার্ভের পরিমাণ কমে গিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে, যখন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মুখে ছিল, রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে এবং দেশটি তীব্র ডলার সংকটে পড়ে। সেই সময়ে ডলার বিনিময় হার ১২৮ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সংকটের পর অবসান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভ পুনরুদ্ধার শুরু হয় এবং বর্তমান রিজার্ভের স্তর তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রেমিট্যান্সের এই উত্থান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আর্থিক প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রবাসী সম্প্রদায়ের অর্থায়ন এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের ব্যয় কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে, রিজার্ভের পুনরুদ্ধার এবং ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং রিজার্ভের স্থিতিশীলতা দেশের আর্থিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে রেমিট্যান্সের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক নীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুটোই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।



