মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরে অভিবাসন ও ভিসা নীতিতে তীব্র পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এক লক্ষেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা রদ করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এই পদক্ষেপটি প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কঠোর বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বাতিল হওয়া ভিসার বেশিরভাগই পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভিসা, যাঁরা নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। এছাড়াও প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এবং দুই হাজার পাঁচশত বিশেষায়িত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ভিসা রদ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এই ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে মার্কিন আইনের অধীনে অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশেষায়িত কর্মীদের ক্ষেত্রে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, মারামারি এবং চুরির মতো অপরাধ ভিসা বাতিলের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে মাদক পাচার, শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছেন, জননিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করা কারোকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হবে না।
প্রশাসন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বৈধ ভিসাধারী বিদেশি নাগরিকের তথ্য পুনরায় যাচাই করার উদ্যোগ চালু করেছে। এই কাজের জন্য একটি নতুন ‘কন্টিনিউয়াস ভেটিং সেন্টার’ গঠন করা হয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ও যাচাই কাজ করবে। কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রক্রিয়া একটি চলমান ব্যবস্থা হিসেবে ভবিষ্যতেও চালু থাকবে।
গত নভেম্বরেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছিল, ট্রাম্পের শপথগ্রহণের পর থেকে প্রায় ৮০ হাজার অ-অভিবাসী ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এই ভিসা বাতিলের পেছনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, হামলা এবং চুরির মতো অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধী বহিষ্কার কর্মসূচি’ চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ২০ জানুয়ারি ২০২৫-এ দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ গ্রহণের পর এই নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেন।
ভিসা বাতিলের পরিসংখ্যানের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপটি অভিবাসন নীতি কঠোর করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে কিছু মানবাধিকার সংস্থা এই ধরনের ব্যাপক রদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের উপর প্রভাব।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভিসা রদের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আইনি ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। রদকৃত ভিসা ধারকদের পুনরায় আবেদন করার সুযোগ থাকবে, তবে তাদের পূর্বের অপরাধমূলক রেকর্ড পরিষ্কার না হলে পুনরায় অনুমোদন কঠিন হবে।
নতুন কন্টিনিউয়াস ভেটিং সেন্টারটি ডেটা বিশ্লেষণ ও রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ভিসা ধারকদের পটভূমি যাচাই করবে। এই কেন্দ্রের কাজের মধ্যে ভিসা আবেদনকারীর পূর্বের অপরাধ রেকর্ড, ভিসা মেয়াদ শেষের পরের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কার্যকলাপের পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
এই উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ও তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, ভিসা নীতি কঠোর করার ফলে বৈধ পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীর ওপরও প্রভাব পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে নীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের প্রথম বছরে ভিসা বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির একটি মূল অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নীতি কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন প্রবাহকে প্রভাবিত করবে, তা পরবর্তী সময়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে।



