বাড়িতে টাকা নিয়ে কথা বলা এখনও বেশিরভাগ পরিবারের জন্য নিষিদ্ধ বিষয়, তবে সন্তানদের আর্থিক জ্ঞান বিকাশে এই আলোচনাকে বাধা না দিয়ে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। আর্থিক সচেতনতা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তাই এর অভাব ভবিষ্যতে ঋণ ও আর্থিক সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকে বড় হওয়া অনেকের জন্য পরিবারের আয়, ভাড়া, ইউটিলিটি বিলের পরিমাণ জানার সুযোগ ছিল না; পিতামাতার সঙ্গে টাকা নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনের খরচের সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে না। এই প্রজন্মের অনেকেই এখনই বুঝতে পারছেন যে, আর্থিক শিক্ষা না থাকলে বড় হয়ে ভুল সিদ্ধান্তে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে যায়।
একটি পরিবারে, ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে বাজারে নিয়ে যাওয়া একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করেছে। শিশুটি যখন কয়েক মাসের বয়সে ঘরে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায় না, তখন তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া তাকে শব্দ, অক্ষর ও সংখ্যা শিখতে সাহায্য করে। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম, ব্র্যান্ডের পার্থক্য এবং প্যাকেজের তথ্য পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে সে স্বাভাবিকভাবে আর্থিক সচেতনতা অর্জন করে।
বাজারে গিয়ে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য তুলনা করা, প্যাকেজে থাকা পুষ্টি তথ্য পড়ে স্বাস্থ্যকর পছন্দ করা, এবং পোশাক, জুতা ইত্যাদির দাম জানার মাধ্যমে শিশুটি ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক নীতি শিখে। এই অভিজ্ঞতা তাকে মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করে, যাতে সে ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ও দরকারী পণ্য বেছে নিতে পারে।
দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শিশুটি বুঝতে পারে যে, অর্থ উপার্জন কঠোর পরিশ্রমের ফল এবং তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা দরকার। এই বয়সে সে ইতিমধ্যে জানে যে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
পরিবারের আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে শিশুকে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া একটি কার্যকর উপায়। জন্মদিন, উৎসব বা অন্যান্য বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রাপ্ত নগদ উপহারকে সঞ্চয় হিসাবেই রাখলে, সে সঞ্চয়ের গুরুত্ব ও লক্ষ্য নির্ধারণের অভ্যাস গড়ে তোলে।
সঞ্চয়ের পাশাপাশি, শিশুকে ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ দেয়া তাকে কাজের মূল্য বুঝতে সাহায্য করে। বাড়ির কাজ, পারিবারিক ব্যবসা বা প্রতিবেশীর সাহায্য করে কিছু টাকা উপার্জন করা, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ শিখায়।
বিভিন্ন আর্থিক পণ্য, যেমন ক্রেডিট কার্ডের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেডিট কার্ডের অতিরিক্ত ব্যবহার ও ঋণগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণ দেখিয়ে শিশুকে দায়িত্বশীল ব্যয়ের গুরুত্ব বোঝানো যায়।
বড়দের আর্থিক সিদ্ধান্তের ফলাফল সরাসরি পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রভাব ফেলে; তাই সন্তানকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গঠনে সহায়ক হয়। যখন বাবা-মা বাড়ির বাজেট তৈরি করে, তখন শিশুকে খরচের তালিকা, আয়-ব্যয়ের সমতা এবং সঞ্চয়ের লক্ষ্য সম্পর্কে জানানো উচিত।
শিক্ষা ক্ষেত্রে আর্থিক সাক্ষরতা এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, যদিও এটি জীবনের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে যুক্ত। সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠ্যক্রমে মৌলিক আর্থিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই সঠিক আর্থিক অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।
অভিভাবকরা যদি সন্তানকে নিয়মিতভাবে টাকা নিয়ে আলোচনা করেন, তবে তা পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস বাড়ায়। প্রশ্নোত্তর সেশনের মাধ্যমে শিশুকে তার ব্যয় পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে বলা, তার যুক্তি শোনার মাধ্যমে বাবা-মা তার চিন্তাধারা বুঝতে পারেন।
প্রায়োগিক টিপস: ১) সপ্তাহে একবার পরিবারের বাজেট পর্যালোচনা করুন এবং শিশুকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন; ২) বাজারে কেনাকাটার সময় দাম তুলনা করার চ্যালেঞ্জ দিন; ৩) সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ছোট পুরস্কার দিন; ৪) ক্রেডিট কার্ডের ঝুঁকি নিয়ে সহজ উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করুন; ৫) সন্তানকে নিজের ব্যয় রেকর্ড রাখতে উৎসাহিত করুন। এই সহজ পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।



