রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডা. কাইছার রহমান চৌধুরীর অডিটোরিয়ামে ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত অধ্যাপক আলী রীয়াজ ব্যক্তিবিশেষের স্বৈরাচার রোধে দ্বিকক্ষীয় আইনসভার প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতা ও একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার একত্রিকরণকে মূল সমস্যারূপে চিহ্নিত করেন।
রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানের কাঠামোগত ঘাটতি কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা একাধিকবার একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই প্রবণতা মোকাবেলা করা জরুরি।” তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে অতীতের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের অভাবকে উল্লেখ করেন।
সভায় বিভাগীয় কমিশনার ড. এ.এন.এম. বজলুর রশীদ সভাপতিত্বে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐক্যমত্য) মনির হায়দার, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস.এম. আব্দুর রজ্জাক, রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান এবং রাজশাহী পুলিশ কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিভাগের সব জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য সরকারি কর্মী, স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এ ধরনের সমাবেশের লক্ষ্য ছিল গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
অধ্যাপক রীয়াজের মতে, “আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই যেখানে সকল নাগরিকের সমতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তবে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে আমরা এই আদর্শ পূরণে ব্যর্থ হয়েছি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, দলীয় বিবেচনা ও ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১৯৭২ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তিনি পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের তরুণ প্রজন্মকে পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে, যা এখনো আমাদের দায়িত্বের অংশ।” রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কাঠামোকে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থেকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
তিনি আরও যোগ করেন, “গণভোটের মাধ্যমে আমরা মৌলিক পরিবর্তনগুলোকে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে পারি।” রীয়াজের মতে, আসন্ন গণভোটকে দেশের ভিত্তি গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা উচিত।
সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও মন্তব্য করেন যে, গণভোট যদি প্রত্যাশিত ফল না দেয় তবে তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যদিও তার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি, তবু তিনি ভোটের গুরুত্ব ও সম্ভাব্য পরিণতি তুলে ধরেছেন।
এই মতবিনিময় সভা রাজশাহী বিভাগের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় স্তরে গণভোটের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে।
অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী এই আলোচনাকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও স্বৈরাচার রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা রীয়াজের দ্বিকক্ষীয় সংসদ প্রস্তাবকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিবৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
গণভোটের ফলাফল কীভাবে দেশের শাসনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে রীয়াজের বক্তব্য স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, আলী রীয়াজের এই বক্তব্য রাজশাহীর রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে, যেখানে দ্বিকক্ষীয় সংসদ, স্বৈরাচার রোধ এবং গণভোটের মাধ্যমে দেশের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।



