যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাস ইরানে বসবাসরত আমেরিকান নাগরিকদের তৎক্ষণাৎ দেশ ত্যাগের পরামর্শ জানিয়েছে। নির্দেশনা সোমবার স্থানীয় সময়ে প্রকাশিত হয় এবং দেশের জুড়ে বাড়তে থাকা প্রতিবাদ ও সম্ভাব্য সহিংসতার ঝুঁকিকে প্রধান উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ মুহূর্তে ইরানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানে গত কয়েক সপ্তাহে শুরু হওয়া প্রতিবাদগুলো ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কিছু এলাকায় সহিংস রূপ ধারণের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের রিপোর্ট, গ্রেপ্তার এবং আহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাবন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ এবং ইন্টারনেট সেবার বিচ্ছিন্নতা দৈনন্দিন জীবনে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি নাগরিকদের চলাচল ও যোগাযোগকে কঠিন করে তুলেছে।
বিমান সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি বিবেচনা করে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন জানিয়েছে যে তারা ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ইরানের উড্ডয়ন রুট বাতিল বা স্থগিত করবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে যাতায়াতের বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছে, যা প্রস্থান পরিকল্পনা করা নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দূতাবাসের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইরানে ইন্টারনেট সংযোগের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত এবং বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিকদেরকে মোবাইল ডেটা, স্যাটেলাইট ফোন বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের মাধ্যমে সংযোগ বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, জরুরি অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ নথি ও পরিচয়পত্রের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্থান পথ হিসেবে আর্মেনিয়া ও তুরস্ককে প্রধান গন্তব্য হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। উভয় দেশই ইরানের সীমান্তের নিকটে অবস্থিত এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী, নাগরিকদেরকে সড়কপথে এই দেশগুলোতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা ও পারমিটের ব্যবস্থা আগে থেকেই করা উচিত।
দূতাবাস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, প্রস্থান প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করা উচিত নয়। নাগরিকদেরকে স্বনির্ভরভাবে পরিকল্পনা করে, প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ ও ভ্রমণ নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। এই নীতি পূর্বের সমান জরুরি পরিস্থিতিতে গৃহীত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য ছিল।
যারা অবিলম্বে ইরান ত্যাগ করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য দূতাবাস নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও মৌলিক সরবরাহের মজুদ করার পরামর্শ দিয়েছে। খাবার, পানীয়, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে অস্থায়ী সংকটের সময় কোনো ঘাটতি না হয়। এছাড়া, বাসস্থান বা অন্য কোনো সুরক্ষিত ভবনে আশ্রয় নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবাদে জড়িত এলাকায় প্রবেশ না করার জন্যও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদেরকে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদমূলক সমাবেশ থেকে দূরে থাকতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে বলা হয়েছে। এই সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব এলাকায় হিংসা বৃদ্ধি পেতে পারে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যান্য সংকটের সঙ্গে তুলনা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য একই রকম প্রস্থান নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের অবনতি এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ব্যাঘাতই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
একজন কূটনীতিকের মতে, “ইরানে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন”। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আর্মেনিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে সমন্বয় ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় ভিসা ও সীমানা পারাপারের প্রক্রিয়া সহজ হয়। এই মন্তব্যটি দূতাবাসের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনকে প্রতিফলিত করে।
দূতাবাসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। পরবর্তী আপডেটের জন্য নাগরিকদেরকে দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যম চ্যানেলগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া, ইরানের সীমান্তে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্ভাব্য ভ্রমণ সীমাবদ্ধতার বিষয়ে তথ্য শেয়ার করা হবে। এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা নাগরিকদেরকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।



