যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে গিয়ে সেখানে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই কাজটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শাসনক্ষম দেশের স্বায়ত্তশাসনকে লঙ্ঘন করার অভিযোগ উত্থাপন করেছে।
মাদুরো ও ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর পর, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন অন্তর্ভুক্ত। আদালতের কার্যক্রম এখনো চলমান, তবে ইতিমধ্যে এটি একটি রাজনৈতিক নাটকের রূপ নেয়।
এই ঘটনায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের রক্ষার দিক থেকে সমর্থন জানিয়েছে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন্তব্যগুলোকে প্রতিবেশী গলিগলির হুমকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি ভেনেজুয়েলার স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাহ্য করে, নিজ দেশের নাগরিকদের ওপরও সমানভাবে দায়িত্ব পালন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে। লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্য বীমা ছাড়া বেঁচে আছে, খাদ্য নিরাপত্তা হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেকেই খাবার ভাতা নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
অর্থনৈতিক কাঠামোতে শীর্ষ এক শতাংশের হাতে প্রায় নব্বই শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত। এই গোষ্ঠী তেল, ব্যাংকিং এবং সামরিক শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা দেশের নীতি নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি প্রায়শই এই ছোট কিন্তু শক্তিশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা দেশের বাকি ৯৯ শতাংশের জন্য কোনো বাস্তব দায়িত্ব বহন করে না। ভেনেজুয়েলা-সংকটে এই স্বার্থের সংযোগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের শিকড় ১৯৯০-এর শেষের দিকে ফিরে যায়, যখন হুগো চাভেজ দেশের প্রেসিডেন্ট হন। তার আগের সময়ে, ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঘুরে বেড়াত, যাদের উভয়ই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
সেই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদে প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত। তেল রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত বিশাল আয় দেশীয় অভিজাত গোষ্ঠীর সম্পদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাবকে শক্তিশালী করত।
চাভেজের শাসনামলে তেল রাজস্বের পুনর্বণ্টন ও সামাজিক নীতি চালু হলেও, তেল শিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়নি। তেল ও সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী এখনও ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, ট্রাম্পের পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার নতুন পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপট কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতায় প্রশ্ন তুলতে পারে এবং অন্যান্য দেশের স্বায়ত্তশাসনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধান না হলে, এই ধরনের বহিরাগত পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।



