তামিলনাড়ুর চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট নায়ক থালাপতি ভিকি (সি. জোসেফ ভিকি) ২০২৪ সালে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (TVK) গঠন করে, এবং একই বছর চলচ্চিত্র থেকে সরে এসে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে মনোনিবেশের ঘোষণা দেন। তার শেষ চলচ্চিত্র “জনা নায়গন” (জনতার নায়ক) এই মাসে মুক্তি পাবে, যা তার বিদায়ের চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
তামিলনাড়ুতে সিনেমা ও রাজনীতির সংযোগ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এম.জি. রামচন্দ্রন, যাকে এম.জি.আর. নামে পরিচিত, এবং জয়লালিতা উভয়ই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, পরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। রামচন্দ্রন ও জয়লালিতা উভয়ই চলচ্চিত্র থেকে সরে এসে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যক সময় ব্যয় করেন।
এরপরের দশকে রাজনিকান্ত, কমল হাসান, খুশবু এবং বিজয়কান্তের মতো নায়করা চলচ্চিত্রের সঙ্গে রাজনীতিকেও যুক্ত করার চেষ্টা করেন, তবে তাদের ফলাফল ভিন্ন রকম। কমল হাসান একসঙ্গে সিনেমা ও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তবে নির্বাচনী সাফল্য সীমিত ছিল। বিজয়কান্তের দল দ্রুত উত্থান পায়, তবে সংগঠনগত সমস্যার কারণে তা স্থায়ী হয়নি। তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিবেশ অর্ধেক প্রচেষ্টাকে সহ্য করে না।
ভিকি এই প্রেক্ষাপটে তার রাজনৈতিক পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনীতি কোনো হালকা কাজ নয়; ভোটারদের পূর্ণ মনোযোগ ও সময়ের প্রয়োজন। তামিলনাড়ুর ইতিহাসে দেখা যায়, যারা চলচ্চিত্র থেকে সরে এসে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যক সময় ব্যয় করেছেন, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন।
“জনা নায়গন” চলচ্চিত্রটি রাজনৈতিক চিত্র ও ভাষায় সমৃদ্ধ হবে এবং দেশের বিভিন্ন শহর ও বিদেশে প্রায় পাঁচ হাজার থিয়েটারে প্রদর্শিত হবে। ৫১ বছর বয়সে ভিকি তার ক্যারিয়ার থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও তিনি এখনও ভারতের অন্যতম আয়করকারী নায়ক হিসেবে বিবেচিত। তার চলচ্চিত্রের আয়, স্যাটেলাইট অধিকার, সঙ্গীত ও মার্চেন্ডাইজিং থেকে প্রাপ্ত আয় তামিল ডায়াস্পোরার মধ্যে ব্যাপক।
চেন্নাইয়ের চলচ্চিত্র সমালোচক আদিত্য শ্রীকৃষ্ণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভিকির জনপ্রিয়তা শুধুমাত্র অভিনয় দক্ষতার ওপর নয়, তার ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। তিনি দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অর্জন করেছেন, যা রাজনৈতিক মঞ্চে তার প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ভিকির রাজনৈতিক দল টিভিকের মূল লক্ষ্যগুলোতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচার অন্তর্ভুক্ত। দলটি তামিলনাড়ুর গ্রামীণ ও নগর এলাকায় সমর্থন গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে। তার দলীয় কাঠামোতে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মী ও তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা যুক্ত হয়েছে।
ভিকির রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া তামিলনাড়ুর অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছ থেকে মিশ্র। কিছু দল তার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তিনি রাজনীতিতে নতুন উদ্যম আনবেন। অন্যদিকে, কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দল তার অভিজ্ঞতার অভাব ও চলচ্চিত্রের পটভূমি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ভিকি তার চলচ্চিত্র “জনা নায়গন” মুক্তির পর তৎক্ষণাৎ রাজনৈতিক কার্যক্রমে মনোনিবেশ করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি নির্বাচনী প্রচার, জনসাধারণের সমাবেশ ও সামাজিক প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। তার দলীয় কর্মীরা ইতিমধ্যে নির্বাচনী তালিকায় প্রার্থীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
ভবিষ্যতে ভিকির রাজনৈতিক প্রভাব কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে তামিলনাড়ুর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অর্জিত জনপ্রিয়তা ও জনমত গঠন ক্ষমতা তাকে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। তার পদক্ষেপের ফলে রাজনীতিতে নতুন তরুণ নেতার উত্থান ঘটতে পারে, যা রাজ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তন আনতে পারে।
তামিলনাড়ুর ভোটারদের জন্য ভিকির ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা নির্দেশ করে যে তিনি চলচ্চিত্রের জগৎ থেকে সরে এসে রাজনীতিতে পূর্ণ সময় দেবে। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দলীয় কাঠামো ও নির্বাচনী কৌশলগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে দেখা যায় তিনি তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করতে সক্ষম হবেন কিনা।



