লিবিয়ার প্রাক্তন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর পর প্রকাশিত শেষ ভাষণ আজ ইরান ও ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনায় পুনরায় আলোচিত হচ্ছে। গাদ্দাফি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে লিবিয়ার শাসনকালে যে নীতিগুলো অনুসরণ করতেন, সেগুলোকে বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার নিজের বাসভবন থেকে অপহরণ করা হয়েছে, যা লাতিন আমেরিকায় রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অপহরণটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং ভেনেজুয়েলায় শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
ইরানে একই সময়ে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর আক্রমণাত্মক নীতি ও অর্থনৈতিক চাপের ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি গাদ্দাফির শেষ বার্তার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যেখানে তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে আক্রমণাত্মক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
ইরানের বর্তমান অবস্থাকে গাদ্দাফির সময়ের লিবিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয় কারণ উভয় দেশই পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখে আছে। ইরান সরকার যুক্তি দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক চাপ তার সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং দেশীয় উন্নয়নকে বাধা দিচ্ছে।
গাদ্দাফির শেষ ভাষণে তিনি নিজের শাসনকালের অর্জনগুলো তুলে ধরেছিলেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি দেশের জন্য ঘর, হাসপাতাল, স্কুল নির্মাণ করেছেন এবং ক্ষুধার্তদের খাবার সরবরাহ করেছেন। এছাড়া তিনি লিবিয়ার মরুভূমিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর করার কথা উল্লেখ করেন।
তার বক্তৃতায় গাদ্দাফি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের নীতিগুলোকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি রিগ্যানের সামরিক হস্তক্ষেপকে লিবিয়ার স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন এবং আফ্রিকান দেশগুলোর সংহতি ও অর্থনৈতিক সমর্থনের পক্ষে কথা বলেন।
গাদ্দাফি সরাসরি গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে তিনি জনগণের কমিটিগুলোকে শাসনের মূল অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে কিছু ধনী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী তার নীতিগুলোকে কখনোই সন্তোষজনক মনে করেনি। তিনি এই গোষ্ঠীর স্বার্থপরতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমালোচনা করেন।
বক্তৃতায় তিনি যুক্তি দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বিনামূল্যের চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের অভাব রয়েছে, যা দরিদ্র জনগণের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। গাদ্দাফি এই বিষয়গুলোকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের মিথ্যা চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন।
গাদ্দাফি নিজেকে জামাল আবদেল নাসেরের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন, যিনি সালাহউদ্দিন আইয়ুবি সময়ের একমাত্র আরব ও মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি নাসেরের স্যুয়েজ খালের পুনরুদ্ধারকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে লিবিয়ার স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
আজকের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গাদ্দাফির শেষ বার্তাকে ইরান ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটে প্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখছেন। উভয় দেশের নেতৃত্বের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলো গাদ্দাফির শাসনকালের স্বায়ত্তশাসন, বহিরাগত হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
এই তুলনা ইরান ও ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি গাদ্দাফির মত স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণ করা হয়, তবে উভয় দেশই পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে নিজস্ব কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল গড়ে তুলতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, গাদ্দাফির শেষ ভাষণ এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে, বিশেষ করে ইরান ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটে। উভয় দেশের নেতৃত্বের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলো গাদ্দাফির শাসনকালের স্বায়ত্তশাসন, বহিরাগত হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গঠন করা হবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।



