দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বনে একটি অদ্ভুত উদ্ভিদ‑প্রজাতি নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। কালো‑বাল্ব আলু (Dioscorea melanophyma) তার ডাঁটা থেকে নকল বেরি‑সদৃশ বুলবিল উৎপন্ন করে, যা পাখিরা খেয়ে গাছের ক্লোন ছড়িয়ে দেয়। গবেষণার ফলাফল জানুয়ারি ১২ তারিখে পিএনএস (Proceedings of the National Academy of Sciences)‑এ প্রকাশিত হয়েছে।
এই আলু প্রজাতি স্বাভাবিকভাবে লিঙ্গগত প্রজনন করে না; ফলে এটি বীজের বদলে নিজস্ব ক্লোন তৈরি করে বেঁচে থাকে। সাধারণত ক্লোন‑উৎপাদনকারী গাছের বুলবিল সাদা বা ম্লান রঙের হয় এবং পিতামাতার কাছাকাছি গজায়। তবে এই প্রজাতি বুলবিলকে গাঢ়, চকচকে বেরির মতো রূপান্তরিত করে, যা পাখির দৃষ্টিতে ফলের মতো আকর্ষণীয় হয়।
পাখি যখন এই নকল বেরি গিলে নেয়, তখন বুলবিলের সংযুক্ত অংশ পাখির পরিপাকতন্ত্রে অক্ষত থাকে এবং পরে মলত্যাগের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে পৌঁছে নতুন গাছের জন্ম হয়। এভাবে গাছের বিস্তার সীমিত পরিবেশের পরিবর্তনের ঝুঁকি কমে, কারণ ক্লোনগুলো বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
গাও চেন, কুনমিং বোটানিক্যাল ইনস্টিটিউটের ইকোলজিক্যাল বায়োলজিস্ট, ২০১৯ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে বীজ সংগ্রহের সময় এই নকল বেরি‑সদৃশ বুলবিলকে ভুল করে ফল হিসেবে ধরেছিলেন। ফলের ভেতরে বীজ না পাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে গাছটি তাকে এবং সম্ভবত পাখিদেরও ধোঁকা দিচ্ছে।
গাও চেনের দল বুলবিলের রঙ, আকার এবং পৃষ্ঠের গঠন বিশ্লেষণ করে নিকটবর্তী প্রকৃত বেরির সঙ্গে তুলনা করে দেখেছে যে, প্রায় পনেরোটি ভিন্ন প্রজাতির বেরি ও বুলবিলের পার্থক্য চোখে পড়ে না। এই ফলাফল দেখায় যে, আলুর নকল বেরি প্রকৃত ফলের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে সমান, যা পাখির জন্য বিভ্রান্তিকর।
বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদবিদ্যা ও বিবর্তনীয় ইকোলজি ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারকে একটি নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক বিবর্তনীয় ইকোলজিস্ট উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের কৌশল গাছকে পরিবেশগত পরিবর্তনের মুখে টিকে থাকতে সাহায্য করে এবং ক্লোন‑প্রজননের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপায়।
গাছের বুলবিল সাধারণত সাদা বা ধূসর রঙের হয়, তবে এই প্রজাতির বুলবিল গাঢ় কালো এবং ঝকঝকে, যা পাখির দৃষ্টিতে ফলের মতো আকর্ষণীয় করে তোলে। গবেষকরা বুলবিলের পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম রঙের পার্থক্যও পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা পাখির দৃষ্টিতে স্বাভাবিক বেরির মতোই প্রতীয়মান হয়।
এই গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় যে, উদ্ভিদগুলো কেবল পোকা বা মাইক্রোঅর্গানিজমকে নয়, পাখিকেও তাদের প্রজনন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। পাখি যেহেতু দূরদূরান্তে উড়ে বেড়ায়, তাই তারা বুলবিলকে নতুন পরিবেশে নিয়ে যায়, যা গাছের বিস্তারের জন্য উপকারী।
গাও চেনের দল এই নকল বেরি‑সদৃশ বুলবিলের গঠন ও কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করতে অতিরিক্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা চালিয়েছে। ফলাফল দেখায় যে, বুলবিলের পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট পিগমেন্ট ও তেল রয়েছে, যা ফলের স্বাদ ও গন্ধের অনুকরণ করে পাখিকে আকৃষ্ট করে।
এই ধরনের উদ্ভিদ‑প্রতারণা পূর্বে অন্যান্য প্রজাতিতে দেখা গিয়েছে, তবে আলুর ক্ষেত্রে প্রথমবার সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কৌশল বিশ্লেষণ করে উদ্ভিদ‑প্রজনন ও সংরক্ষণ নীতিতে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করা সম্ভব।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মতে, এই আবিষ্কার উদ্ভিদ‑প্রজাতির অভিযোজন ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। কীভাবে গাছের জেনেটিক পরিবর্তন নকল ফলের উৎপাদনকে সম্ভব করেছে, এবং এই বৈশিষ্ট্য কতটা দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পাখি ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্কের এই নতুন দিকটি পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও বায়োডাইভার্সিটি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। যদি নকল বেরি‑সদৃশ বুলবিলের মাধ্যমে গাছ দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে স্থানীয় উদ্ভিদ সমতা পরিবর্তিত হতে পারে।
অবশেষে, এই গবেষণা উদ্ভিদ‑প্রজাতির জটিল অভিযোজন কৌশলকে তুলে ধরে এবং বিজ্ঞানীদেরকে প্রাকৃতিক জগতে লুকিয়ে থাকা অপ্রত্যাশিত কৌশলগুলো অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা এই ধরনের উদ্ভিদ‑প্রতারণার পরিবেশগত প্রভাব ও সম্ভাব্য ব্যবহারিক দিকগুলো উন্মোচন করতে পারে।
আপনার আশেপাশের বনে যদি অনন্য গাছের রূপ দেখতে পান, তবে তার ফলের রঙ ও গঠন নিয়ে সতর্ক থাকুন; কখনও কখনও তা প্রকৃত ফলের বদলে ক্লোন‑বুলবিল হতে পারে।



