ইরানের দক্ষিণে একটি ছোট শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষা ফলে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে প্রাণহানি ঘটেছে। গত কয়েক দিনে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে সড়কে নেমে আসা নাগরিকদের উপর স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। গুলিবর্ষা ঘটার পর ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়া হয় এবং দেশীয় মিডিয়ার প্রতিবেদনেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
একজন ৪০ বছরের কাছাকাছি বয়সী নাগরিক, যার নাম ওমিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি গুলিবর্ষা সম্পর্কে জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, নিরাপত্তা কর্মীরা খালি হাতে থাকা প্রতিবাদকারীদের দিকে ক্যালাশনিকভ‑ধরনের রাইফেল চালিয়ে গুলি করে, ফলে মানুষ তাদের দাঁড়িয়ে থাকা জায়গায়ই মরে গিয়েছে। ওমিদের বর্ণনা অনুসারে, গুলিবর্ষার মুহূর্তে তিনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তার কণ্ঠস্বর কম্পিত ছিল।
ওমিদের শহরে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে গত কয়েক দিন ধরে প্রতিবাদ চলছিল। দেশের সামগ্রিক মন্দা এবং মৌলিক পণ্যের দামের দ্রুত বৃদ্ধি মানুষকে রাস্তায় নিয়ে এসেছে। একই সময়ে, রেজা পাহলভি, যিনি শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র, তার সামাজিক নেটওয়ার্কে আহ্বান জানিয়ে বহু মানুষকে প্রতিবাদে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। এই আহ্বান বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃহত্তর মাত্রার প্রতিবাদে রূপ নেয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি পরের দিন একটি কঠোর বার্তা দেন, “ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হাল ছাড়বে না”। তার এই সতর্কতা পরেই নিরাপত্তা বাহিনী ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের আক্রমণ তীব্র হয়, যা পূর্বে তুলনামূলকভাবে কম হিংসাত্মক ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর আক্রমণ থেকে সৃষ্ট সর্বোচ্চ রক্তপাতের সময়কাল এই সতর্কতার পরপরই ঘটে।
সরকারি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় এবং বিদেশি মিডিয়ার প্রতিবেদনকে বাধা দেয়। বিশেষ করে, বিবিসি পার্সিয়ানকে দেশে রিপোর্টিং থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠস্বরকে দমন করার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তেহরানের এক তরুণী নারী বৃহস্পতিবারের ঘটনাকে “বিচার দিবস” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, তেহরানের দূরবর্তী পাড়া-প্রতিবেশেও বিশাল সংখ্যক মানুষ সমাবেশ করেছিল, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর ক্রমাগত গুলিবর্ষা ফলে প্রাণহানি বাড়িয়ে দেয় এবং তার দৃশ্য তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইরানি সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই বিশৃঙ্খলার মূল দায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে এবং ঘটনাটিকে “সন্ত্রাসী কাজ” বলে লেবেল করেছে। রাষ্ট্রপতি ও নিরাপত্তা দপ্তরের মুখপাত্ররা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে দেশীয় নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই রক্তপাতের পরিণতি ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের দিকে ধাবিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও তেল বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।



