ব্যাংকিং সিস্টেমে নতুন নোটের সংরক্ষণ ও ব্যবহার সংক্রান্ত অনিয়মের ফলে গ্রাহকদের আর্থিক অসুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিন মারা, সেলাই করা অথবা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত নোটগুলো সিআরএম (ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন) স্বীকৃতি দিচ্ছে না। ফলে নগদ জমা দিতে চাওয়া গ্রাহককে বারবার শাখায় যেতে হচ্ছে। এই সমস্যার মূল কারণ হল নোটের হালকা ক্ষতি সত্ত্বেও মেশিনের অস্বীকৃতি, যা ব্যাংকিং সেবার গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
সিআরএম মেশিনের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী, সামান্য ফুটো, সেলাইয়ের দাগ বা লাল কালি লিখা থাকলেও নোটকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করা হয়। যদিও নোটটি নতুন এবং মূল্যের দিক থেকে অপরিবর্তিত, তবু মেশিনের অস্বীকৃতি গ্রাহকের জন্য অতিরিক্ত সময় ও শ্রমের ব্যয় ঘটায়। শাখা কর্মীদের কাছেও প্রায়শই নোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ফলে সেবা প্রদানেও বিলম্ব দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটে লাল কালি ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা সত্ত্বেও, বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলা হচ্ছে না। পিন মারা, সেলাই করা এবং লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করা এখনও প্রচলিত, যা নোটের স্থায়িত্বকে হ্রাস করে। ক্ষতিগ্রস্ত নোট দ্রুত ছিঁড়ে পড়ে এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্যতা হারায়, ফলে মুদ্রার মোট পরিমাণে ক্ষতি হয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের অনুশীলন শুধুমাত্র নোটের শারীরিক ক্ষতি নয়, গ্রাহকের ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন গ্রাহক নোট জমা দিতে গিয়ে মেশিনের অস্বীকৃতি পান, তখন তাদের মনে হয় যে ব্যাংক তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে না। এই অবিশ্বাস দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের সুনাম ও গ্রাহক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, বিদেশি মুদ্রা, বিশেষ করে ডলার নোটের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। ডলার নোটে কোনো লাল কালি বা পিনের ব্যবহার নেই, এবং সেগুলো রাবার দিয়ে মোড়ানো করে আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়। এই সতর্কতা নোটের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করে এবং সিআরএম মেশিনে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে না। দেশীয় মুদ্রার তুলনায় ডলার নোটের প্রতি এই যত্নের পার্থক্য গ্রাহকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানিয়েছেন, নতুন নোট হলেও সিআরএম মেশিনে জমা না দিলে তাদের আর্থিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হয়। তারা দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন। এই চাহিদা ব্যাংকিং সেবার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অর্থনীতিবিদরা জোর দিয়ে বলছেন, নোট সংরক্ষণ ও ব্যবহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত নোট দ্রুত বদলে দেওয়ার কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তোলা উচিত। এসব ব্যবস্থা না হলে পিন, সেলাই ও লাল কালি ব্যবহারের ফলে দেশের মুদ্রার ওপর আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
ব্যাংকগুলোকে এখনই নোটের হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে, সিআরএম মেশিনের সফটওয়্যার আপডেট এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, গ্রাহকদের জন্য দ্রুত নোট পরিবর্তনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা আর্থিক লেনদেনে বাধা না পান।
ভবিষ্যতে যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তবে নোটের দ্রুত ক্ষয় ও গ্রাহকের অসন্তোষ ব্যাংকিং খাতের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল ছোট ব্যবসা ও দৈনন্দিন ব্যবহারকারীরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই নীতি প্রয়োগে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্রের মতে, শীঘ্রই নতুন নির্দেশনা জারি করে ব্যাংকগুলোকে নোটের সঠিক হ্যান্ডলিং নিশ্চিত করতে বলা হবে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে সিআরএম মেশিনের অস্বীকৃতি কমে যাবে এবং গ্রাহকের আর্থিক সেবা সহজতর হবে। শেষ পর্যন্ত, নোটের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাংকিং সিস্টেমের স্বচ্ছতা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াবে।



