মোজাম্বিকের দক্ষিণে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লিম্পোপো নদীর বন্যা পরিণত হয় দেশের সর্বকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, যেখানে শত শত মানুষ প্রাণ হারায় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এই বন্যার মাঝখানে জন্ম নেওয়া রোসিতা সালভাদর মাবুইয়াঙ্গোর মৃত্যু সংবাদ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
বন্যা শুরু হয় যখন লিম্পোপো নদী তার ধারার বাইরে গিয়ে গ্রামগুলোকে ডুবে দেয়। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একসাথে ত্রাণ কার্যক্রম চালু করে, তবে অবকাঠামোর অভাব এবং বন্যার তীব্রতা ত্রাণকে কঠিন করে তোলে। এই সময়ে রোসিতার মা, ক্যারোলিনা সিলেসিয়া চিরিন্ডজা, দুই ছোট শিশুকে পিঠে তুলে গাছের ডালে চড়ে বাঁচার চেষ্টা করেন।
ক্যারোলিনা জানান, বন্যা দুপুরের চারটায় তীব্র হয়ে গিয়ে বাড়ির দরজার কাছাকাছি পানি পৌঁছায়, ফলে গ্রামবাসীরা গাছের দিকে পলায়ন করে। তিনি ও তার পরিবারসহ মোট পনেরজন চার দিন গাছের ডালে শরণ নেয়, খাবার না পেয়ে কষ্টে কাঁদে এবং প্রার্থনা করে দিন কাটায়।
বছরের শেষের দিকে, ক্যারোলিনা গর্ভবতী অবস্থায় হঠাৎ শ্রমে পড়েন। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকান সামরিক হেলিকপ্টার বন্যা ত্রাণে উপস্থিত থাকে এবং হেলিকপ্টারটি নবজাতক রোসিতা ও তার মাকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনে। এই দৃশ্যটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং মোজাম্বিকের বন্যার প্রতীকী ছবি হয়ে ওঠে।
রোসিতা ও তার মায়ের এই রেসকিউ দৃশ্যটি বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার গুরুত্বকে তুলে ধরতে কাজ করে। ২০০০ সালের শেষের দিকে, রোসিতা ও ক্যারোলিনা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে আমন্ত্রিত হন, যেখানে তারা কংগ্রেসের সামনে বন্যার পরিণতি ও ত্রাণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। এই সফরটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ নীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে।
মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো রোসিতাকে দেশের মেয়েদের জন্য একটি প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন, তিনি বলেন রোসিতা কঠিন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা এবং আশার বার্তা প্রদান করেছে। রোসিতা পরবর্তী বছরগুলোতে মোজাম্বিকের বিভিন্ন সামাজিক ও স্বাস্থ্য প্রকল্পে অংশ নেন, যদিও তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সীমিত তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের সোমবার, রোসিতার বোন সেলিয়া সালভাদর রোসিতার মৃত্যুর খবর জানিয়ে দেন যে তিনি দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং অজানা রোগের কারণে মারা গেছেন। সেলিয়া জানান, রোসিতা ২৫ বছর বয়সে মারা গেছেন এবং তার মৃত্যু পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলেছে।
রোসিতার পরিবার অনুসারে, তিনি রক্তের রোগের সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তবে সুনির্দিষ্ট রোগের নাম প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘ সময়ের অসুস্থতা তার শারীরিক শক্তি হ্রাস করে, ফলে শেষ পর্যন্ত তার জীবন শেষ হয়।
আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞ ড. অমর সিংহ বলেন, “মোজাম্বিকের ২০০০ সালের বন্যা মানবিক সহায়তার গ্লোবাল নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।” তিনি যুক্তি দেন যে রোসিতা ও তার মায়ের গল্প ত্রাণ কর্মীদের মনোভাবকে শক্তিশালী করেছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্যোগে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে।
বন্যা পরবর্তী বছরগুলোতে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মোজাম্বিককে পুনর্গঠন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করেছে। তবে এখনও অনেক গ্রাম বন্যার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পায়নি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকির পুনরাবৃত্তি নির্দেশ করে। রোসিতার মৃত্যু এই বিষয়গুলোকে পুনরায় আলোচনার দরজা খুলে দেয়।
রোসিতা সালভাদর মাবুইয়াঙ্গোর জীবন ও মৃত্যু মোজাম্বিকের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে। তার জন্মের সময়ের চিত্রটি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা ও দুর্যোগের মুখে মানবিক আত্মার শক্তি তুলে ধরেছে, আর তার মৃত্যুর সংবাদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের দিকে মনোযোগী করতে আহ্বান জানাবে।



