ঢাকায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন একটি গোলটেবিল বৈঠকে রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়িক নেতা এবং শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা বাস্তবিক ও কার্যকর কর্মসংস্থান পরিকল্পনার দাবি তুলে ধরেন। অংশগ্রহণকারীরা কর্মসংস্থানকে দেশের অগ্রগতি ও তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান বাংলাদেশিদের প্রধান অগ্রাধিকার, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। তিনি বলেন, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও নিশ্চিত নয় যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসংস্থানের চাহিদাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মারিনা সুলতানা জানান, প্রতি বছর ১১ থেকে ১২ লাখ তরুণ বিদেশে কাজের জন্য পাড়ি জমাচ্ছে, যার বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। তবে দক্ষতার ঘাটতি ও কাজ না পাওয়ার কারণে গত বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন, যা রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
বিএনপির পলিসি টিমের সদস্য সাইয়েদ আবদুল্লাহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি দক্ষতা উন্নয়ন, আইটি খাতের সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ভাষা শিক্ষার সূচনা পরিকল্পনা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হাফিজুর রহমানও তরুণদের কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, উপজেলা পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, যুবঋণ কর্মসূচি এবং কর সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়িক নেতারা জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ছাড়া কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তারা সরকারকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামো শক্তিশালী করতে এবং শিল্প-প্রশিক্ষণ সংযোগ বাড়াতে আহ্বান জানান।
নীতিনির্ধারকরা উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে স্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসংস্থান নীতি প্রণয়ন করা জরুরি, যাতে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করা যায়। তারা প্রস্তাব করেন, কর্মসংস্থান পরিকল্পনা তৈরিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যবহার করা।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, প্রবাসী কর্মী ফিরে আসার মূল কারণ হল দক্ষতার ঘাটতি এবং দেশের অভ্যন্তরে উপযুক্ত কাজের সুযোগের অভাব। তারা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এবং চাকরি সৃষ্টির জন্য উদ্যোক্তা সমর্থন বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
বৈঠকের আলোচনায় কর্মসংস্থান নীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও উঠে আসে। এ ধরনের কমিটি নীতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে সময়মতো সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রণয়নে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ভাষা ও আইটি প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করার কথা উল্লেখ করে। তারা বিশ্বাস করে, এই ধরনের দক্ষতা তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াবে।
বৈঠকের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, কর্মসংস্থান না থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে। তারা আগামী সপ্তাহে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত স্পষ্ট নীতি ও বাস্তবিক পরিকল্পনা তৈরি হওয়ার আশা করা হচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে সহায়তা করবে।



