ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মতান্ত্রিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি কহামেনি এখন তার ক্ষমতার স্থায়িত্বের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন রেভল্যুশনারি গার্ড (IRGC) এর সমর্থনে তিনি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নীতি পরিচালনা করেছেন। তবে সাম্প্রতিক গৃহস্থ বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে এই সমর্থনভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
IRGC কেবল ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্প তত্ত্বাবধান করে না, দেশের বাণিজ্যিক সেক্টরের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে। এই সামরিক-অর্থনৈতিক জোট কহামেনির অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে কুদস ফোর্সের মাধ্যমে ইয়েমেন থেকে লেবানন পর্যন্ত গড়ে তোলা “প্রতিরোধের অক্ষ” ইরানের মধ্যপ্রাচ্যীয় প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এই শক্তির কেন্দ্রে এখন স্পষ্ট ফাটল দেখা দিচ্ছে। ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিতর্ক, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় সৃষ্ট গণবিক্ষোভকে কহামেনি সরকার কঠোরভাবে দমন করেছিল। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিশাল প্রতিবাদও একইভাবে দমন করা হয়েছিল। যদিও সেসব দমনকৃত আন্দোলন সাময়িকভাবে নীরব হয়েছে, তবে সেগুলো সমাজের গভীরে অবশিষ্ট অশান্তি বাড়িয়ে তুলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় ভিন্ন। ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সমষ্টিগত ক্ষোভ, দুর্নীতি ও তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা একত্রে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সরকার মাঝে মাঝে সামাজিক বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে জনমত প্রশমনের চেষ্টা করলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এখনো অদূর।
আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ইরান চাপে আছেই। অক্টোবর ২০২৩-এ গাজা যুদ্ধের সূচনা এবং ইসরায়েলের কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে ইরানের মিত্র গোষ্ঠী হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। লেবাননে গত বছর পেজার ও ওয়াকি-টকি বিস্ফোরণ হিজবুল্লাহকে বড় ধাক্কা দিয়েছে, যা তার সামরিক সক্ষমতাকে হ্রাস করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জুন ২০২৫-এ ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা বোমা হামলার মাধ্যমে লক্ষ্য করে। পরবর্তীতে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি, তবে তা তেহরানের জন্য একটি তীব্র সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহৎ বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দল কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। এয়ার ফোর্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের কোনো প্রতিক্রিয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কঠোর হবে বলে ইঙ্গিত দেন। এই সতর্কতা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে আরও অস্থির করতে পারে।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য এখন দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, গৃহস্থ বিক্ষোভের তীব্রতা কমাতে অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারমাণবিক ও সশস্ত্র নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা কহামেনির ক্ষমতার ভিত্তি আরও ক্ষয় করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে যদি সরকার বিক্ষোভের মূল কারণ—দরিদ্রতা, বেকারত্ব ও দুর্নীতি—সমাধানে অক্ষম থাকে, তবে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ প্রতিবাদ ও সম্ভবত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি সমতা পুনর্গঠনে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, কহামেনির শাসনব্যবস্থা এখন অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক চাপের দ্বৈত পরীক্ষার মুখে। গৃহস্থ বিক্ষোভের তীব্রতা, অর্থনৈতিক সংকটের অব্যাহত অবস্থা এবং পারমাণবিক নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি একসাথে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



