আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) আজ গাম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাওদা জাল্লোর প্রতিনিধিত্বে রোহিঙ্গা জনগণের বিরুদ্ধে মিয়ানমার কর্তৃক গৃহীত ‘গণহত্যা’ নীতি নিয়ে শুনানি চালিয়ে যাচ্ছে। গাম্বিয়া ২০১৯ সালে এই মামলাটি দায়ের করে, যেখানে মিয়ানমারকে মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগণকে ধ্বংস করার ইচ্ছা প্রকাশের অভিযোগ করা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে, দাবি করে যে তার সামরিক অভিযানগুলো কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ২০১৭ সালের আক্রমণে রোহিঙ্গা জনগণের ওপর ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে; হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৭,০০,০০০ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করেছে। জাল্লো আদালতে উল্লেখ করেন যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় বহু দশক ধরে নিপীড়নের শিকার হয়েছে, পাশাপাশি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে তাদের মানবিক মর্যাদা হ্রাস করা হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়নের পর সামরিক বাহিনীর আক্রমণকে ‘গণহত্যা নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের একটি বিশদ প্রতিবেদন মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে গৃহীত নীতি ও কর্মকে ‘গণহত্যা’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর তদন্তের আহ্বান জানায়। মিয়ানমার সরকার এই প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করে, দাবি করে যে তার কার্যক্রম কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়।
আইসিজে-তে শোনার সময় গাম্বিয়ার প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন যে, গাম্বিয়া নিজেই সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে এই মামলাটি দায়ের করার নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করেছে। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।”
শুনানির সময় আদালত তিন দিন সাক্ষ্য শোনার জন্য আলাদা করেছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্ণনা শোনা হবে। তবে এই সাক্ষ্যগুলো জনসাধারণ ও মিডিয়ার জন্য বন্ধ থাকবে, যাতে শিকারদের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়। শোনানির সময়সীমা মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা হচ্ছে, এবং চূড়ান্ত রায়ের জন্য কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
আইসিজে সরাসরি ব্যক্তিগত অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে না, তবে তার রায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের নীতি নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। গাম্বিয়া ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য এই মামলাটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিয়ানমার সরকার এখনও তার অবস্থান বজায় রেখেছে এবং আইসিজে-তে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। আদালতকে রোহিঙ্গা জনগণের ওপর গৃহীত নীতি ও কর্মের বৈধতা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এই মামলার ফলাফল প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই মামলাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির প্রয়োগ এবং জাতিসংঘের ন্যায়বিচার কাঠামোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ, মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং গাম্বিয়ার মানবাধিকার নীতি এই শুনানির ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হবে।



