ইরানের রাজধানী তেহরানে সোমবার জাতীয় সমাবেশের আয়োজনের মাধ্যমে সরকার রাস্তার ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গত দুই সপ্তাহে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে শুরু হওয়া প্রতিবাদগুলো দ্রুত দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থা ও সক্রিয় কর্মীরা সতর্কতা প্রকাশ করেছে। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত না হলেও, দমনমূলক কার্যক্রমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগও তীব্র হয়েছে।
ইরান সরকার ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে তিন দিন অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে তথ্য প্রবাহ সীমিত করেছে। এই পদক্ষেপটি দমনকাণ্ডের প্রকৃত মাত্রা গোপন করার উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিস্তৃত সমাবেশের আহ্বান জানিয়ে সরকার তেহরানের এনগেলাব স্কোয়ারে হাজারো নাগরিককে জাতীয় পতাকা হাতে উপস্থিত হতে বলেছে। সমাবেশে শোকের প্রার্থনা ও শহীদদের স্মরণে ধর্মীয় পাঠ করা হয়, যা রাষ্ট্রের ‘দাঙ্গা’ হিসেবে চিহ্নিত ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সভার সময় পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ দেশকে “চার-মুখী যুদ্ধ”ের মুখে বলে উল্লেখ করেন। তিনি অর্থনৈতিক, মানসিক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষ এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা “ইসরায়েলকে মরণ, যুক্তরাষ্ট্রকে মরণ” শ্লোগান উচ্চারণ করে, এবং গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আক্রমণ হলে ইরানের সামরিক বাহিনী তাকে অমর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা দেবে বলে সতর্কতা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসা প্রতিবাদে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেন। তিনি ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে একই সঙ্গে ইরানকে হুমকি দেওয়ার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তেহরানের এক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্মেলনে জানিয়ে দেন যে দেশ যুদ্ধের সন্ধান করছে না, তবে যেকোনো সামরিক হুমকির মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে “যুদ্ধের প্রস্তুতি” হিসেবে উল্লেখ করে, কূটনৈতিক সমাধানের দরকারীয়তা জোর দেন।
এই ঘটনাগুলি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারী সমাবেশের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান এবং একই সঙ্গে কঠোর দমনকাণ্ডের সমন্বয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের ইন্টারনেট বন্ধ করা, সমাবেশের আয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনার সূচক হিসেবে দেখছেন। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শমনের সম্ভাবনা থাকলেও, উভয় পক্ষের রেড লাইন অতিক্রমের ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান।
ইরানের সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কথোপকথন, পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে চলমান প্রতিবাদ ও দমনকাণ্ড, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতি কীভাবে বিকশিত হবে, তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, ইরানে সরকারী সমাবেশের মাধ্যমে জনমতকে পুনর্গঠন করার প্রচেষ্টা, দমনকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট মানবিক ক্ষতি, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মধ্যে জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতা ও অভ্যন্তরীণ সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি শমনের সম্ভাবনা রয়ে গেছে, তবে তা অর্জনের জন্য উভয় পক্ষের দৃঢ় ইচ্ছা প্রয়োজন।



