পাবনা জেলার পরিচিত সঙ্গীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী প্রলয় চাকী, ১১ জানুয়ারি রাতের দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) চিকিৎসা শয্যায় শেষ শ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃতদেহ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ১২ জানুয়ারি বিকেলে পরিবারকে হস্তান্তর করা হয় এবং একই সন্ধ্যায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
প্রলয় চাকীকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪-এ পাবনা শহরের পাথরতলা এলাকায় তার নিজ বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর হামলার মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরিবার জানায়, আন্দোলনকারীদের চাপের ফলে তাকে এইভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রলয় চাকী, যিনি ১৯৯০-এর দশকে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, তখনই তার ভাই মলয় চাকীর সঙ্গে টিভি ম্যাগাজিন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোতে গানের মাধ্যমে সাড়া ফেলেছিলেন। যদিও তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে পারফরম্যান্সের সুযোগ পেতে পারেন, পরিবার দাবি করে তিনি কখনোই পাবনা ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি।
প্রলয়ের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি মামলা না থাকলেও পরিবার তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করে। তিনি পাবনা জেলার আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, কোনো অপরাধমূলক অভিযোগের মুখে না গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন।
প্রলয়ের ছেলে সানী চাকী জানান, বাবার হৃদরোগের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে না রেখে সাধারণ প্রিজন সেলে রাখা হয়। সেলটি যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় রোগের অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। পরিবারকে রোগের অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি, যা অবহেলার অভিযোগের মূল ভিত্তি।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রলয়ের মৃত্যুর পরপরই তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা গ্রেপ্তার, কারাবন্দি ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের দায়িত্বশীলদের বিচারের দাবি করে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও পাবনা-৫ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুলও প্রলয়ের মৃত্যুর ওপর মন্তব্য করে, অবহেলায় মৃত্যুর কোনো ন্যায় নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রলয় ও মলয়ের দেশব্যাপী খ্যাতি তুলে ধরে বলেন, তারা কোনো দলের শত্রু নয় এবং সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছেন।
শিমুলের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রলয়ের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় আইনি নথিতে নাম না থাকলেও, রাজনৈতিক চাপের ফলে তাকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে দেখানো হয়। তিনি এ বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন যে, কোনো দলীয় বিরোধের ভিত্তিতে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়।
প্রলয়ের মৃত্যুর পর, পাবনা জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে বলে জানানো হয়েছে। টাস্কফোর্সের দায়িত্বে রয়েছে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া, কারাবন্দি শর্তাবলী এবং হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা পর্যালোচনা করা।
টাস্কফোর্সের প্রথম রিপোর্টে প্রলয়ের কারাবন্দি শর্তে সিসিইউতে না রাখার কারণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নির্ধারণের প্রস্তাব থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রলয়ের পরিবার এবং সমর্থকগণ টাস্কফোর্সের স্বচ্ছ ও দ্রুত কাজের দাবি করে, যাতে দায়ী ব্যক্তিরা যথাযথ শাস্তি পায়। তারা এছাড়াও ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা রোধে কারাবন্দি শর্তে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর, পাবনা জেলার অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও প্রলয়ের মৃত্যু নিয়ে শোক প্রকাশ করে এবং কারাবন্দি অবস্থায় চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নের জন্য সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানায়।
সামগ্রিকভাবে, প্রলয় চাকীর মৃত্যু একটি গুরুতর মানবাধিকার ও আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিক্রিয়া দাবি করে। ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো ও কারাবন্দি শর্তে চিকিৎসা সেবার মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।



