গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (GIJN) ২০২৫ সালের জন্য “বাংলাদেশের সেরা তদন্তমূলক গল্প” তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় মোট আটটি প্রতিবেদন রয়েছে, যার মধ্যে দৈনিক স্টার থেকে দুইটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি দেশের গোপন নজরদারি ব্যবস্থার উন্মোচন, আর দ্বিতীয়টি ধলেশ্বরী‑শীতলক্ষ্যা মিলনস্থলে সিমেন্ট কারখানার অবৈধ ভূমি দখল।
প্রথম প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশনস মনিটরিং সেন্টার (NTMC) একত্রে ১,৩৮২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের নজরদারি সরঞ্জাম ক্রয় করেছে। এই সরঞ্জামগুলোকে একত্রিত করে একটি জাতীয় পর্যায়ের ইন্টারসেপশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনটি আমদানি রেকর্ড এবং চুক্তিপত্রের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। ডেটা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার একাধিক ধাপে দেশীয় নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা টেলিকম ও ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের ব্যাপক পর্যবেক্ষণকে সম্ভব করে।
NTMC দীর্ঘ সময় ধরে “ইন্টিগ্রেটেড লফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেম” (ILIS) নামে একটি বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিকম ডেটা রিয়েল-টাইমে ধরা, ডিক্রিপ্ট করা, বিশ্লেষণ করা এবং সংরক্ষণ করা সম্ভব।
ILIS এর ক্ষমতা সরকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয়কৃত নজরদারির নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। একাধিক সংস্থা একই সময়ে একই ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারবে, যা তথ্য শেয়ারিংকে দ্রুততর এবং বিস্তৃত করে তুলবে।
প্রতিবেদনের প্রকাশের পর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ২০২৫ সালের টেলিকমিউনিকেশন (সংশোধনী) আদেশের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এই আদেশে NTMC-কে বিলুপ্ত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত, যা গোপন নজরদারির কাঠামোকে মূলত পরিবর্তন করবে।
দ্বিতীয় প্রতিবেদনে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর মিলনস্থলে মুনশিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকায় শাহ সিমেন্টের একটি উৎপাদন কমপ্লেক্সের অবৈধ ভূমি দখল প্রকাশ পেয়েছে। এই কমপ্লেক্স প্রায় ২৪ একর জমি দখল করেছে, যা নদীর পরিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনটি দেখায় যে সিমেন্ট কারখানার নির্মাণের ফলে নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়েছে এবং মাটি ক্ষয় ও জল দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীরা ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের ফলে আয়হ্রাসের মুখোমুখি।
এই বিষয়টি প্রকাশের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শাহ সিমেন্টকে অবিলম্বে ব্ল্যাকলিস্ট করার আহ্বান জানায়। TIB উল্লেখ করেছে যে পরিবেশগত নিয়ম লঙ্ঘন এবং অবৈধ ভূমি দখল দেশের আইনগত কাঠামোর বিরুদ্ধে।
দুইটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের প্রকাশ রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। গোপন নজরদারির প্রকাশ সরকারকে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য করবে, আর পরিবেশগত অবৈধতা মোকাবিলায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি বাড়বে।
প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে নীতি সংশোধন ও আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশন সংশোধনী আদেশের অনুমোদন এবং শাহ সিমেন্টের বিরুদ্ধে আইনি মামলা উভয়ই দেশের জনমত ও আন্তর্জাতিক নজরদারির অধীনে চলবে।
ভবিষ্যতে এই ধরনের তদন্তমূলক কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে মিডিয়া স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, সরকারী সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়িয়ে নাগরিকদের বিশ্বাস পুনর্গঠন করা জরুরি।



