ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সোমবার টেহরানের একটি বিশাল সমর্থক সমাবেশে দেশের বর্তমান প্রতিবাদ তরঙ্গের মোকাবিলাকে “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি ইরানের রাজধানীর তেহরান সিটি পার্কে অনুষ্ঠিত র্যালিতে এই বক্তব্য দেন, যেখানে হাজারো সমর্থক একত্রিত হয়েছিলেন।
সমাবেশে গালিবাফ ইরানকে “চার-মুখী যুদ্ধ”ে লিপ্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি অর্থনৈতিক, মানসিক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ সামরিক, এবং আজকের সন্ত্রাসী যুদ্ধকে আলাদা করে তালিকাভুক্ত করেন। এই চারটি ক্ষেত্রকে একসাথে মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে, এটাই তার মূল বার্তা।
অর্থনৈতিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে গালিবাফ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপকে ইরানের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। মানসিক যুদ্ধের মধ্যে তিনি বিদেশি মিডিয়া ও সাইবার হুমকিকে উল্লেখ করে, দেশের মানসিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
সামরিক যুদ্ধের দিক থেকে গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন, এবং তাদের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও ইসরায়েলের ইরানের নীতি বিরোধিতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেন, যা পূর্বে বহুবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রকাশ পেয়েছে।
সন্ত্রাসী যুদ্ধের উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে র্যালিতে “ইসরায়েলকে মরণ, আমেরিকাকে মরণ” শ্লোগানগুলোও উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয়। এই স্লোগানগুলো পার্লামেন্ট স্পিকারের বক্তৃতার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে দৃশ্যমান ছিল এবং সমাবেশের অংশগ্রহণকারীরা তা জোরে চিৎকার করে প্রকাশ করেন।
গালিবাফ বলেন, “মহান ইরানি জাতি কখনোই শত্রুকে তার লক্ষ্য অর্জন করতে দেয়নি”। তিনি দেশের ঐতিহাসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসকে তুলে ধরে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতির ঐক্য বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একটি কঠোর সতর্কতা প্রকাশ করেন। গালিবাফের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে ইরানের সামরিক বাহিনী তাকে এমন একটি শিক্ষা দেবে যা কখনো ভুলে যাবে না। এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এই র্যালি অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় ইরানের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ আন্দোলন তীব্রতর হয়েছে। কর্মীরা অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। গালিবাফের বক্তব্যকে সরকারী সমর্থন হিসেবে দেখার পাশাপাশি, বিরোধীরা এটিকে দমন নীতি বাড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গালিবাফের রেটোরিককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৌতায় ইরানের রকেট ও ড্রোন প্রোগ্রাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, আর ইসরায়েল ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগের বিষয়ে সতর্কতা জানিয়েছে। উভয় দেশই ইরানের র্যালে উত্থাপিত হুমকির প্রতি কূটনৈতিক নোটে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
দেশীয়ভাবে গালিবাফের বক্তৃতা সরকারকে অভ্যন্তরীণ অশান্তি দমন ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। র্যালিতে উপস্থিত ভিড়ের সংখ্যা ও শ্লোগানের তীব্রতা দেখিয়ে সরকার তার সমর্থনভিত্তি দৃঢ় করতে চায়। তবে বিরোধী গোষ্ঠীর মতে, এ ধরনের রেটোরিক সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে গালিবাফের মন্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করবে। তাই র্যালির পরবর্তী দিনগুলোতে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা ও সমঝোতার প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত।



