চিলিতে অবস্থিত ভেরা সি. রুবিন পর্যবেক্ষণাগার সম্প্রতি একটি নতুন গ্রহাণু শনাক্ত করেছে, যার ঘূর্ণন সময় মাত্র ১১২ সেকেন্ড। ৫০০ মিটারের বেশি ব্যাসের এই বস্তুটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণু হিসেবে স্বীকৃত। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, এত দ্রুত ঘূর্ণনের জন্য এটি কঠিন শিলার গঠনে হতে হবে, নইলে ভেঙে পড়তে পারত।
এই গ্রহাণুকে ২০২৫ এমএন৪৫ নাম দেওয়া হয়েছে এবং এটি রুবিন পর্যবেক্ষণাগারের প্রথম পর্যায়ের চিত্র থেকে উদ্ভূত। রুবিনের কাজ হল প্রতি কয়েক রাতে দক্ষিণ আকাশের সম্পূর্ণ দৃশ্য ধারণ করা, যা দশ বছর ধরে চলবে এবং গ্রহাণুসহ বিভিন্ন আকাশীয় বস্তুর পরিবর্তন ট্র্যাক করতে সহায়তা করবে।
গত বসন্তে নয়টি রাতের মধ্যে তোলা “প্রথম দৃষ্টিপাত” চিত্রগুলোতে প্রায় ২১০০টি সৌরজগতের বস্তু সনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আগে কখনো দেখা যায়নি। এই বিশাল ডেটাসেট থেকে গবেষকরা ৭৬টি গ্রহাণুর ঘূর্ণন সময় নির্ণয় করতে সক্ষম হন, যার মধ্যে ২০২৫ এমএন৪৫ বিশেষভাবে নজরে আসে।
গ্রহাণুর ঘূর্ণন গতি নির্ণয়ের পদ্ধতি হল তার আলোর তীব্রতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা। যখন গ্রহাণু তার অক্ষের চারপাশে ঘোরে, তখন সূর্যের আলো তার পৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে পড়ে, ফলে দেখা যায় আলোর উজ্জ্বলতা বাড়া-কমা। এই পরিবর্তনের চক্র বিশ্লেষণ করে ঘূর্ণন সময় নির্ধারণ করা যায়।
ঘূর্ণন গতি গ্রহাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন ও উপাদান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। দ্রুত ঘূর্ণন মানে গ্রহাণুটি যথেষ্ট দৃঢ় হতে হবে, যাতে নিজেকে ভেঙে না ফেলে। অন্যদিকে, অধিকাংশ বড় গ্রহাণু ‘রাবল পাইল’ নামে পরিচিত, যেখানে শিলার টুকরো টুকরো একত্রে যুক্ত থাকে এবং তারা ধীর গতিতে ঘোরে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাবল পাইল ধরনের গ্রহাণু ২.২ ঘণ্টার বেশি ঘূর্ণন সময়ে স্থিতিশীল থাকে; এর চেয়ে দ্রুত ঘোরালে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে রুবিনের ডেটা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি গ্রহাণু এই সীমা অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে তিনটি পাঁচ মিনিটের কম সময়ে একবার ঘোরে। পূর্বে দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণুর রেকর্ড ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে।
২০২৫ এমএন৪৫-এর ঘূর্ণন সময় ১১২ সেকেন্ড, অর্থাৎ প্রায় দু’মিনিট, যা পূর্বের রেকর্ডের তুলনায় অনেক দ্রুত। এই ফলাফল নির্দেশ করে যে এই গ্রহাণুটি সম্ভবত একক কঠিন শিলার গঠনে, রাবল পাইল নয়। তাই বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এর অভ্যন্তরে উচ্চ ঘনত্বের পাথর বা ধাতব উপাদান থাকতে পারে, যা দ্রুত ঘূর্ণনকে সহ্য করতে সক্ষম।
এই আবিষ্কার গ্রহাণু গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, বিশেষ করে বৃহৎ আকারের দ্রুত ঘূর্ণায়মান বস্তুগুলোর গঠনগত বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে। রুবিন পর্যবেক্ষণাগারের ধারাবাহিক স্ক্যানিং ভবিষ্যতে আরও এমন অস্বাভাবিক গ্রহাণু শনাক্ত করতে পারে, যা আমাদের সৌরজগতের গঠন ও বিকাশের ইতিহাসে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্য এই তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি গ্রহাণুর সংঘর্ষের ইতিহাস, ভৌত বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য বিপদের মূল্যায়নে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে আরও বিশদ গবেষণা এবং টেলিস্কোপের সাহায্যে এই ধরনের দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণুর সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
আপনার কি মনে হয়, এমন দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্রহাণু আমাদের গ্রহের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি তৈরি করতে পারে, নাকি এগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের নতুন দিক উন্মোচন করে? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



