জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সর্বশেষ সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্নীতির প্রভাবের কারণে বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গিয়েছে, ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দেখা দিচ্ছে। তবে, প্রবাসী কর্মীদের থেকে প্রাপ্ত আয় পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
সোমবার এনইসি সম্মেলনকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সভায় ২ লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদিত হয়। এই অনুমোদন সত্ত্বেও, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও এডিপি বাজেটের কোনো হ্রাস করা হয়নি।
বাজেটের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, পূর্বে চলমান প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বেশ কিছু প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যা নতুন প্রকল্পের নিয়োগে বিলম্বের কারণ হয়েছে। তদুপরি, দরপত্রের নতুন নিয়মাবলী প্রয়োগের ফলে প্রকল্প সংশোধনেও অতিরিক্ত সময় লেগেছে।
এইসব জটিলতা মিলিয়ে এডিপি বাস্তবায়ন পূর্বের তুলনায় কম হচ্ছে। উপদেষ্টা আরও জানান, এনইসি সভায় প্রকল্প পরিচালকদের জন্য একটি পুল গঠন করা হবে, যাতে দ্রুত নিয়োগ সম্ভব হয়। এছাড়া, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ৫০ কোটি টাকার নিচের প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা মন্ত্রী বা উপদেষ্টা অনুমোদন করতে পারবেন, আর ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে তা একনেকে কমিটিতে পাঠাতে হবে।
এডিপি প্রকল্পে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক সরকারের সময়ে প্রকল্পের হিড়িক (হেডকোয়াটার) প্রায়ই জটিল হয়ে থাকত, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তা কমে গিয়েছে। এখন প্রকল্পগুলোকে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অনুমোদন করা হচ্ছে, ফলে কিছু মন্ত্রণালয় এখনও প্রস্তাবনা জমা দিচ্ছে না।
সামাজিক খাতের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রচলন সম্পর্কে উপদেষ্টা সতর্কতা জানান। তিনি বলেন, অতীতে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করা হতো, যদিও তা দেশের উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে। এখন ঋণ গ্রহণের আগে কৌশলগত মূল্যায়ন করা হবে।
বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে পরবর্তী সরকারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পায়রা বন্দর, মেট্রোরেল, এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের খরচ ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। এই প্রকল্পগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিসিআরটি (ব্রিজড র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট) প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একাধিক বিকল্প অনুসন্ধান করা হচ্ছে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, প্রকল্পের রুট, খরচ এবং পরিচালন মডেল নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বিশ্লেষণ চালু রয়েছে।
সার্বিকভাবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং নতুন দরপত্র নীতির প্রভাবের ফলে এডিপি বাস্তবায়নের গতি হ্রাস পেয়েছে, যদিও বাজেটের পরিমাণ অপরিবর্তিত। বিনিয়োগের ঘাটতি এবং প্রকল্প পরিচালনার সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সরকার নতুন কাঠামো গড়ে তুলছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি প্রবাসী আয় এবং বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে মন্দার প্রভাব কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে, প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যাবে।
ভবিষ্যতে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নতুন নীতি ও প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করবে, তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীরা সতর্কতা বজায় রাখছেন।



