ইক্তিয়ারুদ্দিন মো. মামুন, ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এনবিআর) এর একজন কমিশনার, চুক্তিভিত্তিকভাবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এই পদবিন্যাসটি আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
নিয়োগটি ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (২০১৫ সংশোধিত) এর ধারা ২৪ এবং ২০১৯ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নিয়মের ধারা ২২ অনুসারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে। আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট করে দেয় যে, নতুন প্রধানের দায়িত্বে আর্থিক গোপনীয়তা ও লেনদেনের নজরদারি অন্তর্ভুক্ত।
মামুনকে ব্যাংকিং সেক্টরের ডেপুটি গভার্নরের সমতুল্য পদ ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এবং তিনি পূর্ণকালীন কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে এই পদবিন্যাস কার্যকর হবে, যা আর্থিক নীতি নির্ধারণে তার প্রভাব বাড়াবে।
নিয়োগের শর্ত হিসেবে, মামুনকে তার মেয়াদকালে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সাথে পেশাগত সংযোগ বজায় রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। এই শর্তটি তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে গৃহীত হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নির্দিষ্ট শর্তাবলী একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আদেশে উল্লেখ করেছে। চুক্তিতে বেতন, সুবিধা এবং দায়িত্বের বিশদ বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
গত সেপ্টেম্বর, সরকার একটি পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মানসুর ছিলেন। এই কমিটি বিএফআইইউর পরবর্তী প্রধানের সুপারিশ করার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়।
কমিটির গঠনটি পূর্বে বিএফআইইউর প্রধান এএফএম শাহিনুল ইসলামকে পদত্যাগের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়। সরকার একটি তদন্ত প্যানেল গঠন করে ইসলাম সংক্রান্ত বিতর্কিত ছবি/ভিডিওর সত্যতা যাচাই করে, যার ফলাফল তার পদচ্যুতি ঘটায়।
বিএফআইইউ আর্থিক লেনদেনের নজরদারি, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে মূল ভূমিকা পালন করে। নতুন প্রধানের নিয়োগের ফলে এই ইউনিটের কার্যকরিতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
এনবিআরের কমিশনার পদ থেকে মামুনের স্থানান্তর ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউয়ের নেতৃত্বে সাময়িক শূন্যতা সৃষ্টি করবে, তবে একই সঙ্গে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটে তার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে নীতি প্রয়োগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনবে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা এই নিয়োগকে মানি লন্ডারিং বিরোধী নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আরও শক্তিশালী ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবে, যা স্বল্পমেয়াদে অপারেশনাল খরচ বাড়াতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের আর্থিক সেক্টরে প্রবেশের বাধা কমবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন প্রধানের পদক্ষেপগুলো বাজারের ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করছে।
দুই বছরের মেয়াদে মামুনের লক্ষ্য হবে বিএফআইইউর তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা উন্নত করা, আন্তর্জাতিক মানের AML (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং) সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বিত কাজের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের দ্রুত সনাক্তকরণ।
একই সঙ্গে, তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে। তাই চুক্তিতে নির্ধারিত স্বার্থসংঘাত নিষেধাজ্ঞা এবং স্বচ্ছতা প্রক্রিয়া এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, ইক্তিয়ারুদ্দিন মো. মামুনের বিএফআইইউ প্রধান পদে নিয়োগ আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন শক্তি যোগাবে, ব্যাংকিং খাতে নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করবে। তবে তার স্বতন্ত্রতা ও কার্যকরী স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে কিনা, তা ভবিষ্যতে পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় হবে।



