ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ফোরাম নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি স্মারক জমা দিয়ে দ্বৈত নাগরিকদের পার্লামেন্টে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফোরাম দাবি করে যে সংবিধানের ধারা ৬৬(২)(ক)‑এর বর্তমান ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয় এবং তা সংশোধনের প্রয়োজন।
ফোরামের convener, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্যারিস্টার মনওয়ার হোসেন উল্লেখ করেন যে ধারা ৬৬ ১৯৭২ সালে গৃহীত হয়েছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সঙ্গে সমর্থনকারী ব্যক্তিদের সংসদে আসা রোধের জন্য। তিনি বলেন, আজকের বৈশ্বিক বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করে এই বিধান পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
২০০৮ সালের সরকারী নোটিফিকেশন এবং পরবর্তী নাগরিকত্ব আইনগুলো ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বৈধ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মনওয়ার যুক্তি দেন যে ধারা ৬৬‑এর মূল উদ্দেশ্য এখন আর প্রযোজ্য নয়।
২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী ধারা ৬৬(২এ) যুক্ত করে, যা স্পষ্ট করে যে কেবল তখনই নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রে প্রার্থীতা অযোগ্য হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান দ্বৈত নাগরিকদের উচ্চতর বিচারিক পদে বাধা দেয় না, ফলে সংসদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
২০০২ সালের হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল যে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনই প্রার্থীতা অযোগ্যতার ভিত্তি। তবে বেশ কয়েকজন সংবিধানিক আইনজীবী মনে করেন, পঞ্চদশ সংশোধনী এই রায়কে পরিবর্তন করেছে এবং এখন বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের শর্তে অযোগ্যতা আর প্রযোজ্য নয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস (কাজাল) উল্লেখ করেন যে এখনো স্পষ্ট নয় কীভাবে কোনো বিদেশি নাগরিকত্বকে কার্যকরভাবে ত্যাগ করা যায়। বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া ভিন্ন হওয়ায় এই বিষয়টি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নটি বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তীব্রতা পেয়েছে। যদি সংবিধানের ধারা ৬৬‑এর ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হয়, তবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের অনেক নেতা ও রাজনৈতিক প্রার্থী নতুন সুযোগ পেতে পারেন।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে এই পরিবর্তন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ফোরাম ও সমর্থকরা জোর দিয়ে বলেন, বৈধ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক।
নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত স্মারকের উপর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি। তবে তারা বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত পরামর্শ সভা ও আইনি বিশ্লেষণ করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে।
আইনি পণ্ডিতরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে সংবিধানের সংশোধনী প্রক্রিয়া দ্রুততর করা উচিত, যাতে নির্বাচনের সময়সূচি ব্যাহত না হয়। একই সঙ্গে, দ্বৈত নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করে একটি নিয়মাবলী তৈরি করা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের ফলাফল ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে। যদি ধারা ৬৬‑এর ব্যাখ্যা আধুনিকায়িত হয়, তবে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে এবং দেশের নীতি-নির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ হবে।
অবশেষে, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত এই আলোচনাটি দেশের সংবিধানিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নির্বাচনী ন্যায়বিচারকে একসাথে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের উপর গভীর প্রভাব ফেলবে।



