পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছে। ইডি দাবি করে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই‑প্যাক’ এর বাড়ি ও দফতরে কেন্দ্রীয় তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ নিয়ে গেছেন। মামলাটি ইডির তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতকে সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ইডি জানায়, ৮ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই‑প্যাক’ এর মালিক প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি শুরু হয়। তল্লাশির মূল উদ্দেশ্য ছিল কয়লা ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত বহু বছরের পুরোনো মামলার সাথে সংস্থার যুক্তি যাচাই করা। তল্লাশি চলাকালে মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি সবুজ ফাইল এবং হার্ডডিস্কসহ অন্যান্য নথি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি দাবি করেন যে, এই নথিগুলি তার দলের নির্বাচনী কৌশল সংক্রান্ত এবং তাই তিনি সেগুলি সংগ্রহ করে গেছেন।
ইডি অনুসারে, মুখ্যমন্ত্রী তল্লাশি স্থানে প্রায় চার ঘণ্টা সময় কাটিয়ে আরও বেশ কিছু ফাইল সংগ্রহ করেন এবং সেগুলি তার গাড়িতে লোড করে সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রদর্শন করেন। এই ঘটনার পর, ইডি ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টে মামলায় ইডির বিরুদ্ধেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল মামলা দায়ের করেছে। এখন ইডি সুপ্রিম কোর্টে একই অভিযোগ নিয়ে আবেদন করেছে, যাতে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)কে মামলাটি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইডি এছাড়াও হাইকোর্টে আবেদন করেছে যে, ‘আই‑প্যাক’ এর মালিকের বাড়ি ও দফতরে থেকে নেওয়া নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণগুলো ফেরত দেওয়া হোক। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া দুইটি মামলার শুনানি ১৪ জানুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। একই সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করে আদালতকে একতরফা রায় না দিয়ে বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলও ইডির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা ইডির তল্লাশি ও মামলার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে আদালতে আপিল দায়ের করেছে। দলটি দাবি করে যে, তল্লাশি সময় মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি স্বাভাবিক এবং কোনো নথি জবরদস্তি করে নেওয়া হয়নি। তাছাড়া, তারা ইডির মামলায় উল্লেখিত নথিগুলোর স্বচ্ছতা ও প্রমাণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই মামলায় উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছে। ইডি জোর দিয়ে বলেছে যে, তল্লাশি চলাকালে মুখ্যমন্ত্রীর নথি নেওয়া তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং তাই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর দল ইডির অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করে আদালতে বিরোধিতা করছে।
আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের রায় এই ধরনের উচ্চ-প্রোফাইল মামলায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদি আদালত ইডির দাবিকে সমর্থন করে, তবে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর তল্লাশি ও নথি জব্দের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ হতে পারে। অন্যদিকে, যদি মুখ্যমন্ত্রীর দল সফল হয়, তবে রাজনৈতিক নেতাদের তল্লাশি সময়ের অধিকার ও সীমানা স্পষ্ট হবে।
এ পর্যন্ত উভয় পক্ষই মামলার পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপেক্ষা চলমান, এবং ১৪ জানুয়ারি নির্ধারিত হাইকোর্টের শুনানিতে উভয় পক্ষের যুক্তি শোনা হবে। এই মামলাটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবং কেন্দ্রীয়-রাজ্য সম্পর্কের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনী কৌশল ও তদন্তের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলোচনায়।
মামলার ফলাফল কী হবে তা অনিশ্চিত, তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ও রাজ্য সরকারের মধ্যে আইনি সংঘর্ষের মাত্রা বাড়ছে। উভয় পক্ষের দাবি ও প্রতিক্রিয়া পরস্পর বিরোধপূর্ণ হওয়ায়, আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ধারণ করবে।



