যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরবর্তী ভেনেজুয়েলা তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন বাহিনী ৩ জানুয়ারি কারাকাসে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও ট্রেজারি মন্ত্রণালয় ভেনেজুয়েলা তেলের উত্তোলন ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধান করবে বলে ঘোষণা করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তেল ক্রয় সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, রিলায়েন্সের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মিটিং করে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করছেন।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগার পরিচালনা করে এবং একই রাজ্যে আরেকটি শোধনাগারও রয়েছে। আম্বানি বিশ্বব্যাপী তেল ব্যবসায়ের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প শাসনামলে ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয়ের জন্য ওয়াশিংটন থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত করলেও, বায়ডেন সরকারেও নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে। তবুও রিলায়েন্সের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পেলে ভেনেজুয়েলা তেল উত্তোলন ও বিক্রয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রিলায়েন্সের এই উদ্যোগ ভেনেজুয়েলা তেল বাজারে নতুন প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যা গ্লোবাল তেল সরবরাহের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। রিলায়েন্সের বিশাল শোধনাগার ক্ষমতা ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলা তেলকে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিক অস্থিরতা এই পরিকল্পনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রিলায়েন্সের জন্য ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে, কারণ এটি কোম্পানির কাঁচামাল সরবরাহের বৈচিত্র্য বাড়াবে এবং তেল মূল্যের ওঠানামার প্রভাব কমাবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল সম্পদে সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলা তেল বাজারে নতুন মূল্য নির্ধারণের মেকানিজম গড়ে উঠতে পারে, যা আন্তর্জাতিক তেল দামের গঠনকে প্রভাবিত করবে।
তবে, রিলায়েন্সের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন প্রাপ্তি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত পূরণ করা। যদি অনুমোদন না মেলে, কোম্পানি তেল ক্রয় থেকে বাদ পড়বে এবং তার কৌশলগত পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, অনুমোদন পেলে রিলায়েন্সের শোধনাগারগুলো অতিরিক্ত তেল প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম হবে, যা কোম্পানির আয় বৃদ্ধি এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।
ভেনেজুয়েলা তেল বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ন্ত্রণের ফলে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্যও সুযোগ-সুবিধা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে তেল উত্তোলন ও বিক্রয়ের জন্য স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রিলায়েন্সের সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে উত্সাহিত করবে। তবে, এই সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্য জটিল আইনি ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে, বিশেষ করে স্যান্সারশিপ ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে।
সারসংক্ষেপে, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলা তেল ক্রয়ের আলোচনা আন্তর্জাতিক তেল বাজারে নতুন গতিপ্রকোপ সৃষ্টি করতে পারে। কোম্পানির শোধনাগার ক্ষমতা, আম্বানির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেল সম্পদে হস্তক্ষেপের সমন্বয় ভবিষ্যতে তেল সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এই পরিকল্পনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা রিলায়েন্সের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।



