গাম্বিয়ার বিচার মন্ত্রী দাওদা জাল্লো আজ আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয় (আইসিজে) সমক্ষে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের অভিযোগ পুনরায় তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই মামলা কোনো তাত্ত্বিক আন্তর্জাতিক আইন বিষয় নয়, বরং বাস্তব মানুষের জীবন ও গল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণকে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধের দায়ে আইসিজের সামনে আনতে চায়। জাল্লো উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে এবং এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করা দরকার।
গাম্বিয়া ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আইসিজে মামলা দায়ের করে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ গণহত্যা সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী মিয়ানমারকে দায়ী করে।
২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের সময় হাজার হাজার মানুষকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়, বহু নারী ও শিশুরা সহিংসতার শিকার হয় এবং লক্ষাধিক মানুষ শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দ্বারা ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী, যদি কোনো গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসের উদ্দেশ্য থাকে, তা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হয়। গাম্বিয়া এই ভিত্তিতে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে।
আইসিজের পূর্ববর্তী রায়গুলো দেখায় যে, আন্তর্জাতিক আদালত জাতীয় স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাহ্য না করে মানবিক অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার যুদ্ধাপরাধ এবং রুয়ান্ডার গণহত্যা মামলায় আদালত উল্লেখযোগ্য রায় প্রদান করেছে, যা বর্তমান রোহিঙ্গা মামলায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
মিয়ানমার সরকার আইসিজের এই মামলাকে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বাইরে। এছাড়া, আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানও মিয়ানমারকে সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক রাশিদ হোসেনের মতে, গাম্বিয়ার এই পদক্ষেপ রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুনরায় উত্থাপন করতে পারে এবং মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, আইসিজের রায় যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার পক্ষে হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।
আইসিজের বর্তমান শুনানি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, উভয় পক্ষের লিখিত যুক্তি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ অগ্রিম নির্ধারিত হয়েছে এবং পরবর্তী মৌখিক শুনানি কয়েক মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। রোহিঙ্গা বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই মামলার ফলাফল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি আদালত মিয়ানমারকে গণহত্যা দায়ী করে, তবে তা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ বরাদ্দ ও মানবিক সহায়তার পুনর্বিন্যাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি রায় অনুকূল না হয়, তবে গাম্বিয়া ও অন্যান্য সমর্থক দেশগুলো অতিরিক্ত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রাখে।
আইসিজের চূড়ান্ত রায়ের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে উভয় পক্ষের আইনজীবী দল ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ও মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে এই মামলার গুরুত্ব অপরিসীম।
গাম্বিয়ার এই আইনি পদক্ষেপ রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের আলোকে পুনরায় আলোচিত করে এবং মিয়ানমারের মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও আইসিজের রায় রোহিঙ্গা জনগণের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



