যুক্তরাজ্য সরকার রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনকে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা জানিয়েছে। ‘প্রজেক্ট নাইটফল’ নামে একটি বিশেষ প্রকল্পের অধীনে ২০০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহনকারী এবং ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ইউক্রেনের দীর্ঘ‑পরিসরের আক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
প্রকল্পের বিবরণ যুক্তরাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে তৈরি করা সব ক্ষেপণাস্ত্রই নাইটফল সিরিজের অংশ হবে। সিরিজের প্রতিটি রকেটের নকশা একই রকম, তবে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গুণগত মানে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। সরকার এই তথ্যকে সরকারি নথি হিসেবে প্রকাশ করে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
উৎপাদন হার প্রতি মাসে দশটি রকেট নির্ধারিত, যা মোট ১২০টি রকেটের বার্ষিক লক্ষ্য পূরণ করবে। প্রতিটি রকেটের মূল্য প্রায় আট লাখ পাউন্ড, যা সামরিক সরবরাহের মধ্যে তুলনামূলকভাবে মাঝারি মূল্যের হিসেবে বিবেচিত। এই খরচে রকেটের উন্নত গাইডেন্স সিস্টেম, দীর্ঘ‑পরিসরের ইঞ্জিন এবং শক্তিশালী ওয়ারহেড অন্তর্ভুক্ত।
নাইটফল সিরিজের রকেটগুলোকে বিভিন্ন ধরণের যানবাহন থেকে নিক্ষেপ করা যাবে, ফলে স্থল‑ভিত্তিক এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্ম উভয়ই ব্যবহার করা সম্ভব। একসঙ্গে একাধিক রকেট চালু করা সম্ভব হওয়ায় শত্রু এয়ার ডিফেন্সের জন্য সবগুলো রকেট আটকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এই বৈশিষ্ট্যটি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে একাধিক লক্ষ্যবস্তু একসঙ্গে ধ্বংস করার সক্ষমতা বাড়াবে।
দীর্ঘ‑পরিসরের ব্যালিস্টিক রকেটের যোগদান ইউক্রেনের কৌশলগত অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে। পূর্বে ইউক্রেনের মূলত স্বল্প‑পরিসরের ট্যাকটিক্যাল রকেট ও ড্রোনের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল, তবে এখন তারা গভীর‑শত্রু লাইন ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারবে। এই ক্ষমতা রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এই সিদ্ধান্তের পেছনের রাজনৈতিক ইচ্ছা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে হামলার মাত্রা বাড়িয়ে বেসামরিক এলাকায়ও বোমা ফেলেছেন, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, পুতিনের এই আচরণকে সহজে মেনে নেওয়া যাবে না এবং যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের পাশে দৃঢ়ভাবে থাকবে। এই রকেটগুলোকে যুক্তরাজ্যের লৌহকঠিন প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপটি ন্যাটো এবং অন্যান্য পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের অংশ, যেখানে ইউক্রেনকে উচ্চমানের সিস্টেম সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়ার আক্রমণাত্মক নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে অন্যান্য ধরণের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করে আসছে, এবং এখন ব্যালিস্টিক রকেট যোগ করে সামরিক সহায়তার পরিসর বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, নতুন রকেটের উপস্থিতি রাশিয়ার কৌশলগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে রাশিয়া যদি এয়ার ডিফেন্সকে শক্তিশালী করে তবে তার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। তবে রাশিয়া এই উন্নয়নকে তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা সংঘাতের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
প্রকল্পের প্রথম রকেটের উৎপাদন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরীক্ষা চালানো হবে। সফল পরীক্ষার পর সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারিত হবে, যা ইউক্রেনের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। যুক্তরাজ্য সরকার এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত সিস্টেমের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখছে।



