রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় রবিবার (১১ জানুয়ারি) রাতে বিষাক্ত মদপানের ফলে তিনজনের মৃত্যু ঘটেছে। মৃতদের মধ্যে গোপালপুর ইউনিয়নের পূর্ব শিবপুর গ্রাম থেকে ৩০ বছর বয়সী সোহেল, বসন্তপুর গ্রামের ৪০ বছর বয়সী আলমগীর এবং তৃতীয় একজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
সোহেল হলেন রফিকুল ইসলামের ছেলে, আর আলমগীরের পিতা হলেন আমিরুল ইসলাম। উভয়ই স্থানীয় গ্রাম থেকে আসা তরুণ, যাঁদের মৃত্যুর খবর পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের স্রোত বয়ে এনেছে। তৃতীয় মৃতের নাম ও বয়স এখনও জানানো হয়নি, তবে স্থানীয় সূত্রে জানানো হয়েছে যে তিনি একই গ্রুপের অংশ ছিলেন।
স্থানীয়দের মতে, রবিবার বিকেলে কিশমত বসন্তপুর নয়াপাড়া গ্রামের আনারুল ইসলামের ছেলে জয়নুল আবেদিনের বাড়ি থেকে মদ কেনা হয়। জয়নুলের কাছ থেকে মদ ক্রয় করে গ্রুপটি সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে পানীয় গ্রহণ করে। মদটি রেকটিফাইড স্পিরিটের ধরণ বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় অবৈধভাবে বিক্রি হয়ে আসছে।
মদ সেবনের পর রাতের অন্ধকারে গ্রুপের সদস্যরা বাড়িতে বিশ্রাম নিতে গিয়ে একের পর এক শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানান, মৃতদের শোবার ঘরে কোনো রকম অস্বাভাবিক গন্ধ বা অস্বস্তি লক্ষ করা যায়নি, তবে শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটায়।
গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলমের মতে, এই এলাকায় বহু বছর ধরে রেকটিফাইড স্পিরিটের অবৈধ বিক্রয় চলেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এই ধরনের মদ সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবহার বাড়ছে। বিষয়টি জানার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চতর কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন।
বদরগঞ্জ থানা ওয়াকিং অফিসার (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার জানান, মৃতদের দেহে রেকটিফাইড স্পিরিটের বিষাক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জয়নুল আবেদিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনি মাদক সরবরাহকারী হিসেবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মদ সরবরাহের পাশাপাশি অন্যান্য অবৈধ পদার্থের সঞ্চালনেও যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
পুলিশের মতে, জয়নুলের বাড়ি থেকে মদ সংগ্রহের রেকর্ড এবং বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে, মদটির নমুনা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার ফলাফল রেকটিফাইড স্পিরিটের উচ্চমাত্রার মেথানল উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
অধিক তদন্তে জানা গেছে, রেকটিফাইড স্পিরিটের অবৈধ উৎপাদন ও বিক্রয় রঙপুর জেলায় দীর্ঘদিনের সমস্যা। স্থানীয় প্রশাসন পূর্বে এই বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে আসলেও, গ্রামাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে অবৈধ মদ বাজারে প্রবেশ করছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, অবৈধ মদ বিক্রয় ও সরবরাহের জন্য দণ্ডবিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া, মদপানের ফলে মৃত্যুর শিকারদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বর্তমানে, মৃতদের পরিবারকে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় সরকার জরুরি তহবিল গঠন করেছে এবং মৃতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে অবিলম্বে মদবিহীন বিকল্প পানীয়ের সরবরাহ বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন জয়নুল আবেদিনের গ্রেফতারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে, মদ সরবরাহের পুরো জাল বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত তদন্ত চালু রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।
এই ঘটনার পর, রংপুরের অন্যান্য উপজেলায়ও অবৈধ মদ বিক্রয় বন্ধ করার জন্য তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পুলিশ মিলিতভাবে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালু করেছে, যাতে গ্রামবাসীরা মদপানের ঝুঁকি ও আইনি পরিণতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেতে পারে।
অবৈধ মদপানের ফলে সৃষ্ট এই দুঃখজনক ঘটনা স্থানীয় সমাজে গভীর শোকের ছাপ ফেলেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা আবারও স্পষ্ট করেছে।



