বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার একটি নতুন সার্কুলার জারি করে, যার মাধ্যমে দেশীয় ব্যাংকের অফশোর ইউনিট, বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেডিট নিয়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করা যাবে। এই ব্যবস্থা সরবরাহ সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি গ্যাস শিল্পকে কাঁচামাল হিসেবে ক্রেডিট সুবিধা প্রদানকে লক্ষ্য করে।
গত কয়েক মাসে গৃহস্থালী ও বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের চাহিদা বাড়ার ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। সিলিন্ডারের আকারভেদে দাম ৩৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
সরকার দাম নির্ধারণের জন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করলেও, নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে গৃহস্থালী, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ছে।
এলপিজি সাধারণত বাল্ক আকারে আমদানি করা হয়, পরে গৃহস্থালী ব্যবহারের জন্য ছোট সিলিন্ডারে পূরণ করা হয়। আমদানির পর সংরক্ষণ, সিলিন্ডারে ভরা এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালন কাজ সম্পন্ন করতে স্থানীয় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত সময় ও সম্পদ ব্যয় করতে হয়, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত বিলম্বের কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এলপিজি সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণের অধীনে করা আমদানি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে স্বীকৃত হবে। এই ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৭০ দিন নির্ধারিত, যা পূর্বে ২৯ ডিসেম্বর জারি করা সার্কুলারে শিল্প কাঁচামাল আমদানির জন্য দেওয়া একই সময়সীমার সমতুল্য।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এলপিজি আমদানিকারকরা একই ২৭০ দিনের ইউজান্স পিরিয়ডের সুবিধা পাবে। ফলে তারা ক্রেডিটের মাধ্যমে বড় পরিমাণে গ্যাস আমদানি করে, পরবর্তীতে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে পারবে। এই ব্যবস্থা সরবরাহের ঘাটতি কমিয়ে মূল্য স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ক্রেডিট সুবিধা পাওয়া আমদানিকারকরা তহবিলের প্রবাহ দ্রুত করতে পারবে, ফলে গুদামজাত গ্যাসের স্টক বাড়বে। স্টক বৃদ্ধি সরাসরি সিলিন্ডারের দামকে নিচের দিকে নিয়ে যাবে এবং ভোক্তাদের জন্য মূল্যসীমা কমে আসবে। তবে ক্রেডিটের শর্ত ও সুদের হার বাজারের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, ক্রেডিটের উপর নির্ভরশীলতা বাড়লে আর্থিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি আমদানিকৃত গ্যাসের চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়, তবে ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন করে শর্ত নির্ধারণ করা জরুরি।
লজিস্টিক দিক থেকে দেখা যায়, বাল্ক গ্যাসের গুদামজাতকরণ ও সিলিন্ডারে পূরণ প্রক্রিয়ায় সময়সাপেক্ষ কাজ রয়েছে। ক্রেডিটের মাধ্যমে ত্বরিত আমদানি হলেও, গুদাম ও পূরণ সুবিধার সক্ষমতা না বাড়লে সরবরাহের গতি ধীর হতে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে গুদাম ও পূরণ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করা উচিত।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন ক্রেডিট সুবিধা এলপিজি বাজারে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে এবং মূল্য স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে। তবে লজিস্টিক অবকাঠামো, ঋণ ঝুঁকি এবং বাজারের চাহিদা সঠিকভাবে মেলাতে নীতি বাস্তবায়নের সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের টেকসই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



