ইন্টারিম সরকার আজ ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর টিআইবি অফিসে অনুষ্ঠিত সংবাদসভার মাধ্যমে জানিয়েছে যে, সরকার ব্যুরোক্রেটিক কাঠামোর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং রাষ্ট্রের কাঠামো পুনর্গঠনের নামে নির্ধারিত বেশিরভাগ সংস্কার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এই বক্তব্য টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান থেকে শোনা গিয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, “এই আত্মসমর্পণের মূল কারণ এবং দুর্বলতার প্রকৃত উৎস কী, তা স্পষ্ট নয়, কারণ আমি সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার অংশ নই।” তিনি বলেন, এই অনিশ্চয়তা সরকারী কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
গত এক বছর অর্ধেকের বেশি সময়ে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি জানান, যদিও বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি উপদেষ্টা পরিষদ বা ক্যাবিনেট রয়েছে, তবে বাস্তব ক্ষমতা সেখানে সীমিত। “আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ও বাস্তব কার্যক্ষমতার মধ্যে স্পষ্ট ফাঁক রয়েছে,” তিনি যোগ করেন।
বক্তব্যের সময় তিনি উল্লেখ করেন, নথি স্বাক্ষর, ধারা সংযোজন বা বাদ দেওয়া, সময়সীমা নির্ধারণ ইত্যাদি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদ নয়, বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কাজ করা অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠীর হাতে থাকে।
এই গোষ্ঠীগুলি কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থও রক্ষা করে বলে তিনি যুক্তি দেন। ফলে, সংস্কারমুখী ধারাগুলি প্রায়শই হ্রাস পায় অথবা সম্পূর্ণ বাদ পড়ে।
বিশেষ করে অ্যান্টি-করাপশন রিফর্ম কমিশন (এসিসি) সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, পরিষদটির কার্যকরী করার জন্য স্পষ্ট ও কৌশলগত প্রতিশ্রুতির অভাব এই বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। “যদি এ সি সি তার মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী ন্যূনতম মাত্রায়ও কাজ করতে পারে, তবে এটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে,” তিনি বলেন।
ইফতেখারুজ্জামান আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যুরোক্রেটিক ব্যক্তিবর্গ যারা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির থেকে উপকৃত, তারা সংস্কার উদ্যোগকে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের বাধা প্রায়শই নিম্নস্তরের কর্মীদেরকে তাদের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালী করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতি দেশের শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংস্কারমূলক নীতি যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তবে জনসাধারণের সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি সরকার ব্যুরোক্রেটিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সংস্কারকে অবহেলা করে থাকে, তবে ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কঠিন হবে। এ ধরণের অবহেলা নির্বাচনী চক্রে বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, টিআইবি এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে পরবর্তী পর্যায়ে আরও তদারকি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির আহ্বান জানাবে বলে ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার যদি সত্যিকারের সংস্কারপ্রবণ হয়, তবে ব্যুরোক্রেসির প্রভাব কমিয়ে নীতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, ইন্টারিম সরকারের বর্তমান অবস্থানকে ব্যুরোক্রেসির কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অধিকাংশ সংস্কার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, যা ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা দাবি করবে।



