২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়ন ও বাড়তে থাকা দামের প্রতিবাদে দরজা বন্ধ করে। এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি দ্রুত জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপান্তরিত হয়, যেখানে নাগরিকদের অসন্তোষ সরকারী নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
বাজারের বন্ধের পরপরই প্রতিবাদ তেহরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, কর্মী, ছাত্র ও নারী সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী রাস্তায় নেমে আসে। সরকার তীব্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, গুলিবর্ষণ, ব্যাপক গ্রেফতার এবং ইন্টারনেট সংযোগের প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ঘটায়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেসি ইন্টারন্যাশনাল এই পদক্ষেপগুলোকে গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই আন্দোলনকে ২০২২ সালের মহসা আমিনি হত্যার পরের “মহিলা, জীবন, স্বাধীনতা” প্রতিবাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে উভয়ের লক্ষ্য ভিন্ন। পূর্বের আন্দোলন ধর্মীয় তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, আর বর্তমান প্রতিবাদ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সরকারের প্রতিশ্রুতিকে চ্যালেঞ্জ করে, যা দেশের মৌলিক জীবনের নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণগুলো দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি এবং স্বচ্ছতা না থাকা প্রতিষ্ঠান। এই কাঠামো উৎপাদনশীলতাকে দমন করে এবং আনুগত্যকে পুরস্কার দেয়। ফলস্বরূপ মুদ্রাস্ফীতি দৈনন্দিন জীবনে ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে ভোক্তা মূল্যের মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে, যা বেতন ও সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে।
মুদ্রা পতন কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক সংকেত যে রাষ্ট্র আর মৌলিক অর্থনৈতিক গ্যারান্টি বজায় রাখতে ব্যর্থ। রিয়ালের অবমূল্যায়ন নাগরিকদের মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণের ওপর অবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকড় গড়ে তোলে।
অর্থনৈতিক কষ্ট একা শাসন পরিবর্তন করতে পারে না; তা রাজনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে শক্তি পায়। ইরানে পূর্বে প্রতিবাদগুলো প্রায়শই ছাত্র, নারী, শ্রমিক ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্ন ছিল, ফলে সরকার সহজে প্রতিটি গোষ্ঠীকে আলাদা করে দমন করতে পারত। তবে বাজারের বন্ধ একটি নতুন গঠন তৈরি করে, যেখানে বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রতিবাদের বৈধতা ও পরিসর বাড়িয়ে দেয়।
বাজার শুধু পণ্য বিক্রয়ের স্থান নয়, এটি সামাজিক সংযোগের কেন্দ্রও। যখন বাণিজ্যিক গোষ্ঠী রাস্তায় নেমে আসে, তখন সরকার আর এই বিরোধকে সীমিত গোষ্ঠীর অস্থায়ী অশান্তি হিসেবে গণ্য করতে পারে না। এটি একটি অর্থনৈতিক ‘ভোটের অবিশ্বাস’ হিসেবে দেখা হয়, যা শাসনের ক্ষমতা ও নীতির ওপর ব্যাপক প্রশ্ন তুলতে সক্ষম।
সরকারের প্রতিক্রিয়ায় গুলিবর্ষণ, বিশাল সংখ্যক গ্রেফতার এবং ইন্টারনেটের প্রায় সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপগুলো তথ্য প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে এবং নাগরিকদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা সীমিত করে, ফলে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের এই কঠোর দমন নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যতে, যদি বাজারের বন্ধ এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে, তবে শাসনকে অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে ধাবিত হতে হতে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি দমনমূলক পদ্ধতি বজায় রাখে, তবে দীর্ঘমেয়াদে আরও বিস্তৃত সামাজিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে, যেখানে অর্থনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়েছে।



