গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে মোট ৪২৭৪ কোটি টাকা জমা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার নগদ প্রবাহের পুনরুদ্ধারকে সূচিত করে। এই পরিমাণের ফিরে আসা ব্যাংক খাতের তরলতা ও ঋণদানের সক্ষমতায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
পূর্ববর্তী সরকারের সময়কালে অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে ব্যাংক খাতে জনসাধারণের আস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ভয়ভীত হয়ে অনেক গ্রাহক তাদের সঞ্চয় নগদে রূপান্তর করে বাড়িতে সংরক্ষণ করতেন, ফলে ব্যাংকগুলো তীব্র তরলতা সংকটে পড়ে।
তরলতা সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদের হার দিয়ে নতুন আমানত সংগ্রহে বাধ্য হয়েছিল, যা ব্যয়ের চাপ বাড়িয়ে তুলেছিল। একই সময়ে বাড়িতে রাখা নগদের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা অর্থনীতির গতি ধীর করে দিয়েছিল।
সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত মানুষের হাতে থাকা নগদ পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমে গিয়েছিল, যা ব্যাংকগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি বয়ে এনেছিল। মার্চে সাময়িকভাবে নগদ বাড়লেও, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত আবারও হ্রাসের প্রবণতা দেখা যায়।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান উল্লেখ করেন, নগদ টাকা ব্যাংকে ফিরে আসা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে আটকে থাকা টাকা বিনিয়োগে রূপান্তর না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় না।
ব্যাংকে জমা হওয়া তহবিল শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতে ঋণ হিসেবে প্রবাহিত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পূর্বে কিছু সমস্যার কারণে মানুষ আতঙ্কে টাকা তুলে নিয়েছিল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে। ভয় কমে যাওয়ায় গ্রাহকরা আবার ব্যাংকে টাকা জমা করতে শুরু করেছে।
এই প্রবণতা ব্যাংকগুলোর তরলতা অবস্থানকে স্থিতিশীল করেছে, ফলে তারা অতিরিক্ত উচ্চ সুদ ছাড়াই আমানত সংগ্রহ করতে পারবে। তদুপরি, ঋণদানের শর্তাবলীও শিথিল হতে পারে, যা ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সুবিধাজনক হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নগদ প্রবাহের এই ইতিবাচক পরিবর্তন বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করবে এবং বিদেশি মূলধনের আকর্ষণ বাড়াবে। স্থানীয় ব্যবসা সম্প্রসারণে সহজতর আর্থিক শর্তাবলী সরাসরি উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
তবে, জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্পূর্ণ না হলে আবার নগদ উত্তোলনের ঝুঁকি রয়ে যায়। তাই ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন, নগদ টাকা ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমানতের পরিমাণ বাড়বে এবং সুদের হার ধীরে ধীরে কমবে। ফলে ঋণগ্রহীতাদের জন্য ক্রেডিটের প্রাপ্যতা সহজ হবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ত্বরান্বিত হবে।
সংক্ষেপে, ৪২৭৪ কোটি টাকা ব্যাংকে ফিরে আসা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।



