যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার ইরানে চলমান প্রতিবাদে চার দিন ধরে চালু না থাকা ইন্টারনেট পুনরায় চালু করার জন্য টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ইরানের সরকার গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশের অধিকাংশ ডিজিটাল সেবা বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে প্রতিবাদকারীদের তথ্যপ্রাপ্তি ও যোগাযোগে বড় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ইরানে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
স্টারলিংক, যা স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সরবরাহ করে, পূর্বে ২০২২ সালের প্রতিবাদে ইরানীয় নাগরিকদের সরকারী সেন্সরশিপ এড়াতে সহায়তা করেছে। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনও মাস্কের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানে সেবা চালু করার চেষ্টা করেছিল, বিশেষ করে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনি পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর পর ব্যাপক প্রতিবাদে। ট্রাম্পের বর্তমান পরিকল্পনা একই ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা পুনরায় চালু করার দিকে ইঙ্গিত করে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে মাস্কের কোম্পানি এই ধরনের কাজের জন্য উপযুক্ত, কারণ তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা উচ্চ মানের। স্পেসএক্সের প্রতিনিধিরা এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য দেননি। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে ইরানের তথ্যপ্রবাহ কঠিন হয়ে পড়েছে; প্রতিবাদকারীরা সামাজিক মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না, যা সরকারের দমন নীতির কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলেছে।
ট্রাম্প ও মাস্কের সম্পর্কের ইতিহাসে উত্থান-পতন দেখা গেছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাস্কের আর্থিক সমর্থন ট্রাম্পের জয় নিশ্চিত করলেও, পরে মাস্কের ফেডারেল বাজেট কাটার নীতি ও ট্যাক্স বিলের বিরোধের কারণে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনের মধ্যে পুনরায় যোগাযোগের সূত্র পাওয়া যায়; এই মাসে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টে দুজনের একসাথে ডিনার করার খবর প্রকাশিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথেরও আগামী সোমবার টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি সুবিধা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দুজনের সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
ইরানে বর্তমান প্রতিবাদগুলো ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয়, মূলত জ্বালানি ও খাবারের দাম বৃদ্ধির বিরোধে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদকারীরা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিরোধে রূপান্তরিত হয়, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে দেশের শাসনব্যবস্থার সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আন্দোলনের ফলে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে তথ্যের প্রবাহ সীমিত করার চেষ্টা করেছে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সহায়তায় এই নিষেধাজ্ঞা ভাঙার উপায় খোঁজা হচ্ছে।
স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ব্যবহার অন্যান্য সংঘর্ষপূর্ণ অঞ্চলেও দেখা গেছে; উদাহরণস্বরূপ ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের সময় মিশ্রিতভাবে সেবা বন্ধ ও চালু করা হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে, যদি ট্রাম্প ও মাস্কের আলোচনা সফল হয়, তবে স্টারলিংক পুনরায় চালু হয়ে ইরানীয় নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও আন্তর্জাতিক সংযোগে সহায়তা করতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও বিশাল, কারণ এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতির সরাসরি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
ভবিষ্যতে, ট্রাম্পের প্রশাসন যদি ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের জন্য স্পেসএক্সের সঙ্গে সমন্বয় করে, তবে তা ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন গতিবিদ্যা সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপকে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন, তবে একই সঙ্গে ইরানীয় সরকারও প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্প ও মাস্কের আলোচনার ফলাফল ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



