দ্বিতীয় দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ১৩তম সংসদীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নির্বাচন শুধুমাত্র নতুন সরকার গঠনের উদ্দেশ্য নয়; এটি দেশের রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনেরও আহ্বান জানাচ্ছে। ২০২৪ সালের ব্যাপক প্রতিবাদে সিংহাসন থেকে উৎখাত হওয়া স্বৈরশাসন তার বৈধতা হারানোর কারণে নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের ধ্বংসের ফলে পতিত হয়েছিল।
যদি এই নির্বাচনকে শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখা হয়, তবে অতীতের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে, যদি এটি একটি প্রকৃত রিসেটের দরজা হয়ে ওঠে, তবে দেশের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়ে স্থায়ী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। বিশ্লেষকের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনটি মৌলিক নীতি মেনে চলা জরুরি, যা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং দেশের নিজস্ব কষ্টকর শিক্ষা থেকে উদ্ভূত।
প্রথম নীতি হল পার্লামেন্টের নির্বাচিত নির্বাহী ও স্থায়ী নির্বাহী (বিউরোকার্সি) এর ভূমিকা স্পষ্টভাবে আলাদা করা। সংবিধান অনুসারে, আইন ও নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পার্লামেন্টের সদস্যদের, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারি কর্মচারীদের। তবে বাংলাদেশে এই পার্থক্য প্রায়শই উপেক্ষিত হয়; মন্ত্রীরা যদিও নীতি প্রণয়নে দায়িত্বশীল, বাস্তব ক্ষমতা প্রায়শই একটি স্থায়ী ব্যুরোকারেটিভ গোষ্ঠীর হাতে থাকে, যারা নীতি গঠন, বাস্তবায়ন নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করে।
এই অবস্থা কোনো দুর্ঘটনা নয়। দেশের ব্যুরোকার্সি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সরাসরি উত্তরাধিকার, যা মূলত রাজস্ব আহরণ এবং জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল, নাগরিক সেবার জন্য নয়। স্বাধীনতার পরেও এই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে না গিয়ে কেবল নতুন শাসকের হাতে হস্তান্তরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যুরোকারেটিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা ও রেন্টের উৎসে রূপান্তরিত হয়, আর গণতান্ত্রিক তদারকি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে একটি বিশাল সম্পদ-বণ্টন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত বা প্রভাবিত রাজনীতিবিদ, ব্যুরোকার্সি এবং বিচারিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে।
এই নেটওয়ার্কের প্রভাবের ফলে নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা হ্রাস পায় এবং জনসেবা প্রদান ব্যাহত হয়। তাই নির্বাচনের পর পার্লামেন্টের সদস্যদের নীতি নির্ধারণের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, এবং ব্যুরোকার্সিকে শুধুমাত্র নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি। এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে গণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধানকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় নীতি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ মূল প্রবন্ধে উল্লেখ রয়েছে, তবে প্রথম নীতির গুরুত্ব এবং তার বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা এই সময়ে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল যদি সত্যিকারের রিসেটের সূচনা করে, তবে এই নীতিগুলি অনুসরণ করে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করা এবং স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনের সময় দেশের রাজনৈতিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, পার্লামেন্টের সদস্য এবং প্রশাসনিক কর্মীরা তাদের ভূমিকা স্পষ্টভাবে বুঝে কাজ করলে, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারবে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ নীতি গঠন, জবাবদিহিতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করা মূল চাবিকাঠি হবে।



