চট্টগ্রাম শহরে ব্যবসা নেতারা গতকাল একটি রাউন্ডটেবিল আলোচনায় দেশের বাণিজ্যিক নীতিতে ঢাকার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণকে প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তারা উল্লেখ করেন, দেশের অধিকাংশ রপ্তানি-আমদানি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে হয় এবং শহরটি বহু শিল্পবেল্ট ও বৃহৎ হোলসেল বাজারের কেন্দ্রবিন্দু, তবু গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও আর্থিক সিদ্ধান্তের অধিকাংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বহিরাগত বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বন্দর হিসেবে পরিচিত। বন্দর সংলগ্ন এলাকায় চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (EPZ) সহ বেশ কয়েকটি শিল্পবেল্ট অবস্থিত, যা রপ্তানি ভিত্তিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি। এছাড়া খাটুনগঞ্জের বিশাল হোলসেল বাজার দেশের সর্ববৃহৎ পণ্যবাজারগুলোর একটি, যা স্থানীয় ও জাতীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সমর্থন করে।
আলোচনায় উপস্থিত প্রাক্তন বাণিজ্য মন্ত্রী ও বিএনপি স্ট্যান্ডিং কমিটি সদস্য আমির খোসরু মাহমুদ চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় শহরের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি।
টিকেএ গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দারও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অতিরিক্ত ঘনত্ব জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হায়দার চট্টগ্রামের ভূগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যা বাণিজ্যিক প্রবাহ ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি সমুদ্রতটের শিল্পায়নের সম্ভাবনাও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। হায়দার উল্লেখ করেন, উপকূলীয় শিল্পায়ন কেবল রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, দেশের কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির সুরক্ষাতেও সহায়ক হতে পারে। সমুদ্রের নিকটবর্তী উৎপাদন ইউনিটগুলো পরিবহন খরচ কমিয়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুবিধা প্রদান করবে, ফলে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়বে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, যদি চট্টগ্রামের জন্য নীতি ও আর্থিক ক্ষমতা স্থানান্তর করা হয়, তবে বাণিজ্যিক প্রবাহের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়বে। বিশেষ করে, বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিক্স হাবের সৃষ্টি এবং EPZ-গুলোর আধুনিকায়ন দ্রুততর হবে। ফলে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয়করণ বজায় রাখলে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ঢাকার অতিরিক্ত চাপ বাড়বে। জনসংখ্যা ও সম্পদের অসম বণ্টন নগর পরিকল্পনা, পরিবহন জ্যাম এবং বাসস্থানের সংকটের মতো সমস্যাকে তীব্র করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াবে।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকারকে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক অবকাঠামোতে তহবিল বরাদ্দ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে প্রদান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির সুবিধা স্থানীয় শিল্পে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রো-অ্যাকটিভ পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া, সমুদ্রপথে রপ্তানি-আমদানি সহজতর করতে বন্দর আধুনিকায়ন, ড্রাইডক নির্মাণ এবং লজিস্টিক্স সেবা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ার জন্য কেন্দ্রীয়করণ হ্রাস, নীতি ও আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমুদ্রতটের শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং বাণিজ্যিক প্রবাহের গতি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।



