আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি উৎসব চবি মেলা ১৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে। এই বছরের থিম ‘পুনো’, যার অর্থ আবার বা নতুনভাবে শুরু করা, এবং তা পুরো অনুষ্ঠানের কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে ‘আমানুল হক: দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টারিয়ান’ শিরোনামের একটি ফটো প্রদর্শনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রদর্শনীটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণউত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচার, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যাবলি পাশাপাশি দেশের নদী, নারী, গ্রামীণ জীবন এবং সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের ফটোগ্রাফ অন্তর্ভুক্ত। এই ছবিগুলো আমানুল হকের ক্যামেরা লেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহুমুখী দিককে উন্মোচিত করে।
আমানুল হক ১০ নভেম্বর ১৯২৫ (ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৬ কার্তিক, ১৩৩২ বাংলা বছর) সন্ধ্যায় জামুনা নদীর তীরে, সিরাজগঞ্জের কড্ডা গ্রামে তার মাতৃদাদীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তার পিতা ডায়েরিতে এই তারিখটি নথিভুক্ত করেন এবং শিশুটিকে ‘আমানুল হক’ নাম দেন, ঘরোয়া ডাকনাম ‘মতি’।
বাবার চাকরির কারণে তার শৈশব শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া এলাকায় কাটে। পিতার কাজের সুবিধার্থে ১৯৪০-এর দশকে ড. আবদুল হক মোনিরামপুরে একটি বাড়ি কিনে সেখানে স্থায়ী হন। মা হাজেরা খাতুন গর্ভনিরোধে প্রশিক্ষিত একজন দাই, এবং আমানুল হক এক দশটি ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান। তার দুই বোন ছোটবেলায়ই মৃত্যুবরণ করেন।
যৌবনে তিনি নদী ও খালের পথে বার্জে ভ্রমণ করে বাংলার সমতলভূমি অন্বেষণ করেন। ক্যামেরা হাতে তিনি নদীর ধারে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম, নৌকা, জল, আকাশ এবং ভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে নথিভুক্ত করেন। এই ভিজ্যুয়াল নথি তার সময়ের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অনন্য রেকর্ড হয়ে ওঠে।
আমানুল হকের ফটোগ্রাফিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সরলতা ও গভীরতার সমন্বয়। তিনি ছবির মাধ্যমে মানুষের জীবনের সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলোকে ধরা দিয়ে একটি ধ্যানময় পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। তার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের আধুনিক ফটোগ্রাফি চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং পরবর্তী প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার পরিচয় তার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রায়ের সঙ্গে কাটানো সময়ে তিনি চলচ্চিত্রের পেছনের দৃশ্য ও রায়ের সৃজনশীল প্রক্রিয়ার কিছু মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করেন, যা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমী ও গবেষকদের জন্য অমূল্য রেকর্ড।
‘আমানুল হক: দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টারিয়ান’ প্রদর্শনী তার শিল্পী জীবনের একটি সমন্বিত চিত্র তুলে ধরে। ভাষা আন্দোলনের উত্সাহ, মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতা, গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং নদীর স্রোতে ভাসমান মানুষের গল্পগুলো একত্রে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয়। এই ফটো সংগ্রহটি শুধু ঐতিহাসিক নথি নয়, বরং মানবিক অনুভূতির এক গভীর অনুসন্ধান।
চবি মেলায় অংশগ্রহণকারী সকল দর্শককে এই বিশেষ প্রদর্শনীতে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। ছবি দেখার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের অতীতের গৌরবময় মুহূর্তগুলোকে পুনরায় অনুভব করতে পারবেন এবং আমানুল হকের ক্যামেরা লেন্সের মাধ্যমে প্রকাশিত জীবনের রঙিন চিত্রে মুগ্ধ হতে পারবেন।



