ঢাকার হাইকোর্টের দুই বিচারপতি, ফাহমিদা কাদের ও সৈয়দ জাহিদ মনসুর, সম্প্রতি রুল খারিজের মাধ্যমে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তির বর্তমান বিবাহ বজায় থাকাকালীন সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না। এই রায়ের ভিত্তি ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১‑এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছে।
বিচারিকয় রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ১ অনুসারে, বর্তমান বিবাহের সময় কোনো নতুন বিবাহের জন্য সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি অপরিহার্য, এবং অনুমতি ব্যতীত সম্পন্ন হওয়া বিবাহ ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইনের অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত হবে না।
ধারা ২-এ নির্ধারিত হয়েছে যে, অনুমতির জন্য দরখাস্তটি নির্দিষ্ট ফি সহ, চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দফতরে দাখিল করতে হবে। দরখাস্তে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণ, এবং বর্তমান স্ত্রী(গণ)এর সম্মতি আছে কি না, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
ধারা ৩ অনুযায়ী, দরখাস্ত গ্রহণের পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে এবং বর্তমান স্ত্রী(গণ)কে প্রত্যেককে একজন করিয়া প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে নির্দেশ দেবেন। গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহকে ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচনা করলে অনুমোদন দিতে পারে।
ধারা ৪-এ বলা হয়েছে যে, সালিশি কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের কারণাদি লিপিবদ্ধ হবে এবং কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফি প্রদান করে পুনর্বিবেচনার জন্য সহকারী জজের নিকট আবেদন করতে পারবে। একবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আর কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
ধারা ৫-এ অনুমতি ব্যতীত অন্য বিবাহের ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। প্রথমত, বর্তমান স্ত্রী(গণ)কে তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা অবিলম্বে প্রদান করতে হবে; না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায়যোগ্য হবে। দ্বিতীয়ত, অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি আরোপিত হবে।
এই রায়ের পূর্বে ২০২১ সালের চ্যালেঞ্জে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারাগুলোকে অসাংবিধানিক বলে দাবি করা হয়েছিল, তবে হাইকোর্টের রুল খারিজে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং বিদ্যমান বিধান বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিচারিকয় রায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টের বেঞ্চ উল্লেখ করেছে যে, এই বিধানগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নারীর অধিকার সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। রায়ে বলা হয়েছে যে, অনুমতি ছাড়া বহুবিবাহের ফলে সৃষ্ট জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে এই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রায়ের প্রভাব স্পষ্ট। সরকারী পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত আইনের সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় হাইকোর্টের এই রায়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। বিরোধী দলগুলোও এই রায়কে উল্লেখ করে ধর্মীয় ও সামাজিক ন্যায়বিচার বজায় রাখতে সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক রায়ের পরিণতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন, কারণ অনুমতি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও ফি সংক্রান্ত বিষয়গুলো ভবিষ্যতে বিরোধের সূত্রপাত করতে পারে। তবে হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পুনর্বিবেচনার সুযোগ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
ভবিষ্যতে এই রায়ের ওপর আপিলের সম্ভাবনা কম বলে অনুমান করা হচ্ছে, কারণ হাইকোর্ট ইতিমধ্যে ধারাগুলোর সংবিধানিকতা নিশ্চিত করেছে। তবু, আইনসভার সদস্যরা এই রায়ের ভিত্তিতে মুসলিম পারিবারিক আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, যাতে প্রয়োগে সহজতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
সারসংক্ষেপে, হাইকোর্টের রুল খারিজে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বর্তমান বিবাহের সময় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো নতুন বিবাহ বৈধ হবে না, এবং অনুমতি ব্যতীত বিবাহের ক্ষেত্রে কঠোর আর্থিক ও কারাদণ্ডের শাস্তি আরোপিত হবে। এই রায়টি ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের প্রয়োগে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হবে।



