বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর রোববার বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে এক সভায় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার মার্চের মধ্যে ২৫ শতাংশে নামাতে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। তিনি ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, অবলোপন ও আদায় কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দিয়ে ব্যাংকগুলোকে কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানান।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই উচ্চ হার মূলত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে সৃষ্ট।
সেই সভায় গভর্নর ব্যাংকগুলিকে নির্দেশ দেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য সহজ শর্তে পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। একই সঙ্গে তিনি ঋণ আদায়ে জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত তাগাদা জানান, কারণ খেলাপি হার কমাতে ঋণ পুনরুদ্ধারই একমাত্র কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যেখানে মোট ঋণ স্টক ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, মোট ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
গভর্নরের নির্দেশনা অনুসারে, ব্যাংকগুলোকে নীতিমালার আওতায় যতটা সম্ভব উদারভাবে পুনঃতফসিলের সুযোগ ব্যবহার করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের বিশেষ সুবিধা নিয়মিতভাবে প্রদান করা হবে না, তাই ব্যাংকগুলোকে বর্তমান সুযোগটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি হার কমাতে ঋণ আদায়ে তীব্রতা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগ একবারই প্রদান করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা পুনরাবৃত্তি হবে না।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সব ব্যাংকই বিশেষ সুবিধা দিয়ে পুনঃতফসিলের প্রস্তাব গ্রহণ করছে না, তবে গভর্নর নীতিমালার সীমার মধ্যে যতটা সম্ভব উদারভাবে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, নীতি-নির্ধারক ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
ড্রাফ্ট হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, পুনঃতফসিলের সুবিধা গ্রহণের ফলে ডিসেম্বরের শেষে খেলাপি হার প্রায় ৩০.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে পাঁচটি মার্জ হওয়া ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাদ দিলে এই হার ২৫ শতাংশে পৌঁছায়। এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, লক্ষ্য অর্জনের পথে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
গভর্নর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মার্চের মধ্যে সামগ্রিক খেলাপি হারকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঋণ পুনর্গঠন ও আদায়ের তীব্রতা বাড়াতে হবে, যাতে আর্থিক সেক্টরের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।
অধিকন্তু, তিনি উল্লেখ করেন যে, নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ বর্তমানে সীমিত, তাই ঋণ আদায় বাড়িয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে যথাযথ শর্তে পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিদেশে পরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানাধীন এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে লোকসানে কাজ করছে, যদিও তারা বাংলাদেশ থেকে বেতন ও ভাতা সহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে রেমিট্যান্স গ্রহণ করে। এই ক্ষতি ব্যাংক সিস্টেমের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গভর্নর সব ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোকে লাভজনক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তারা আর্থিক ক্ষতি বন্ধ করে স্বাভাবিক ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে। এই নির্দেশনা ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও লাভজনকতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে।
ব্যাংক খাতের জন্য এই নীতি পরিবর্তন ঋণ পুনর্গঠন ও আদায়ের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে, ফলে ক্রেডিটের গুণগত মান উন্নত হবে। তবে দ্রুত পুনঃতফসিলের ফলে কিছু ঋণগ্রহীতা অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি নিতে পারে, যা ভবিষ্যতে ডিফল্টের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মার্চের মধ্যে খেলাপি হারকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যাংকগুলোকে ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল ও আদায়ে তীব্রতা বাড়াতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ, তবে একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করলে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে নীতি-নির্ধারক ও ব্যাংকগুলোর সমন্বিত কাজই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল চাবিকাঠি হবে।



