ঢাকা শহরের গলশান সোসাইটি লেক পার্কে ৯ জানুয়ারি পা কার্নিভাল ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে “একটি প্রাণী‑সুলভ বাংলাদেশ” থিমের অধীনে পোষা প্রাণীর অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই ইভেন্টটি প্রাণীপ্রেমী পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক, শিল্পী ও সাধারণ দর্শকদের একত্রে এনে শহরের প্রাণী‑সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
ঢাকার রাস্তায় প্রায়শই প্রাণীকে গাড়ির হর্নে বাধা দেয়া, পা দিয়ে ধাক্কা খাওয়া এবং কখনো কখনো খাবার দেওয়া হলেও দ্রুতই ভুলে যাওয়া হয়। এমন পরিবেশে পা কার্নিভাল শহরের পোষা প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইভেন্টের দিন লেক পার্কে লেজ, পা ছাপ, সঙ্গীতের সুর এবং প্রাণীপ্রেমী মানুষের ভিড় একত্রিত হয়। ভিড়ের মধ্যে কেবলই না, পার্কের সবুজে ঘেরা পরিবেশে একটি ছোট্ট প্রতিবাদীর মতো অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে, যা ঢাকা শহরের সাধারণ রুটিনকে অস্থায়ীভাবে ভিন্ন রঙে রাঙিয়ে দেয়।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পোষা প্রাণীর মালিক, স্বেচ্ছাসেবক, শিল্পী এবং কৌতূহলী দর্শকরা “একটি প্রাণী‑সুলভ বাংলাদেশ” থিমের অধীনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল উদযাপন করা, তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা: সঙ্গীত থেমে গেলে প্রাণীপ্রতি দয়া কী রূপ নেবে?
শিশুদের জন্য বিশেষভাবে আয়োজন করা “পেইন্ট ফর পস” কর্মশালায় তারা কাগজে কুকুরের নাম, বিড়ালের স্বভাব এবং অন্যান্য প্রাণীর চিত্র অঙ্কন করে। এই চিত্রগুলো শিল্পী রাকিবুল আমিল ও কার্টুনিস্ট মোরশেদ মিশু দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়। শিশুরা যে সরলতা ও সৎ দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়, তা প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সহানুভূতি পুনরুজ্জীবিত করে।
শিশুদের অঙ্কনগুলোতে প্রাণীকে সজ্জা নয়, সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ইভেন্টের মূল বার্তা—”প্রাণী হল সঙ্গী, আনুষঙ্গিক নয়”—কে দৃঢ় করে।
দুপুরের দিকে “হেলদি পস” নামের একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পশু চিকিৎসক ও কল্যাণ কর্মীরা গৃহপোষা প্রাণীর দত্তক, খাবার ও দীর্ঘমেয়াদী যত্ন সম্পর্কে সরাসরি কথা বলেন। তারা উল্লেখ করেন যে প্রাণী বয়স বাড়ে, রোগে আক্রান্ত হয়, আর তাদের যত্নে আর্থিক ও সময়ের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এই আলোচনার মূল বার্তা ছিল—প্রাণীকে ভালবাসা কেবল ইনস্টাগ্রাম পোস্টের জন্য নয়, বরং দৈনন্দিন দায়িত্বের অংশ। শহরের সুবিধা-সুবিধার উপর নির্ভরশীল মানুষদের জন্য এই বাস্তবতা কখনো কখনো অস্বস্তিকর হতে পারে, তবে তা স্বীকার করা জরুরি।
এরপর “অ্যাডপশন অ্যাওয়ারনেস ড্রাইভ” অনুষ্ঠিত হয়, যার হোস্ট পেয়া জান্নাতুল। সোভোতা, মিলা, এভয়েড রাফা ও ব্ল্যাক জ্যাংয়ের লাইভ পারফরম্যান্সে দর্শকরা মুগ্ধ হয়, তবে মূল দৃষ্টি রইল পার্কের কোণায় শান্তভাবে অপেক্ষা করা উদ্ধারপ্রাপ্ত প্রাণীদের উপর। দত্তক গ্রহণকে কেবল একটি অনুভূতিপূর্ণ কাজ নয়, বরং দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
দত্তক গ্রহণের প্রচারমূলক বার্তা স্পষ্টভাবে জানায় যে, একটি প্রাণীকে বাড়িতে আনা মানে তার খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ধারাবাহিক যত্ন প্রদান করা। এই দায়িত্বের স্বীকৃতি ছাড়া দত্তক নেওয়া সম্ভব নয়।
সন্ধ্যায় পেট ফ্যাশন শো এবং ডি.জে. সেশনের মাধ্যমে উৎসবের উল্লাস বজায় থাকে। স্থানীয় খাবার ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের স্টলগুলো সাময়িক বাজারের রূপ নেয়, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য অতিরিক্ত আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে।
পা কার্নিভালের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল প্রাণীকে আলাদা করে উপস্থাপন না করে, শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা। এই ইভেন্টের মাধ্যমে ঢাকা শহরে পোষা প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও প্রাণী‑সুলভ নীতি ও আচরণ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



