কুড়িগ্রাম জেলার দুইটি সরকারি খাদ্য গুদামে মোট প্রায় পাঁচশো টনের বেশি ধান ও চালের হিসাব মিলেনি, তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক তল্লাশিতে প্রকাশ পেয়েছে। কমিশনের দল ১১ জানুয়ারি রবিবার দুপরে নতুন রেলস্টেশন এলাকার গুদামগুলোতে প্রবেশ করে, যেখানে আটটি গোডাউনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শস্যের ঘাটতি ধরা পড়ে। একই দিনে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে দুদকের আরেকটি টিম কুড়িগ্রাম সদর গুদামে ছয়টি পৃথক গোডাউনের তল্লাশি করে, যেখানে একই রকম ঘাটতির সন্দেহ জাগে।
দুদকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নতুন রেলস্টেশন এলাকার গুদামগুলোতে মোট ৫২১ মেট্রিক টন ধান ও ৩৫ মেট্রিক টন চালের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এই পরিমাণ শস্যের হদিস অমিলের ফলে গুদামগুলোকে সিলগালা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দুদকের সূত্র অনুযায়ী, শস্যের ঘাটতির পেছনে কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে। প্রথমত, কৃষকদের সরাসরি সংগ্রহের বদলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিম্নমানের চাল সংগ্রহের অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, নতুন বস্তার পরিবর্তে পুরোনো বস্তা ব্যবহার করা এবং তৃতীয়ত, ধান ও চালকে অন্যত্র বিক্রি করে স্বল্পস্বল্পে অর্থ আত্মসাতের সন্দেহ। এসব অভিযোগের আলোকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার দুদক সহকারী পরিচালক মো. সাবদারুর ইসলাম গুদামগুলোতে ঘাটতি পাওয়া গোডাউনের দরজা সিল করে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গুদামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হদিস অমিলের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি গভীরভাবে তদন্তের পর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও, তল্লাশিতে গুদামগুলোতে অনুপযুক্ত মানের চালও পাওয়া গেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয়।
গুদামগুলোতে সিলগালা করার পরেও, দুদক কর্তৃপক্ষের কাছে গুদামের ব্যবস্থাপনা ও শস্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা বাকি রয়েছে। তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে, শস্যের গুদাম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং বিক্রয় চ্যানেলগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে দুদক দল জানিয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তিনি এই সময়ে উপলব্ধ ছিলেন না। তাই, তার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদক দল এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুদকের তল্লাশি ও সিলগালার পর, গুদামগুলোতে শস্যের হদিস অমিলের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক হিসাব-নিকাশ এবং শস্যের গুণগত মানের বিশ্লেষণ চালু করা হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শস্যের গতি-প্রকৃতি, রেকর্ডের বৈধতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির সূত্র উন্মোচিত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
দুদক কর্তৃক গৃহীত এই পদক্ষেপের ফলে কুড়িগ্রাম জেলার খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, শেষ পর্যন্ত গুদামগুলোতে হদিস অমিলের মূল কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি শাস্তি আরোপ করা হবে, তা তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
এই ঘটনা দেশের অন্যান্য জেলা গুদামেও অনুরূপ সমস্যার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে, ফলে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শস্যের গুদাম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দুদক এই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত তদারকি ও নিয়মাবলী প্রণয়নের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, যাতে ভবিষ্যতে শস্যের হদিস অমিল ও দুর্নীতি রোধ করা যায়।



