মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ৯ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান (টেকনাফ, হোয়াইক্যং) আজ সন্ধ্যায় লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গুলিটি শিশুর মুখের এক পাশে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে আঘাত হানেছে, ফলে তার অবস্থা গুরুতর বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
চিকিৎসা বিভাগে উপস্থিত অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ প্রধান অধ্যাপক হারুন আর রশিদ উল্লেখ করেন, গুলির ক্ষতি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পৌঁছেছে এবং শিশুটি এখন যন্ত্রগত শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তায় রক্ষা পাচ্ছে। তিনি আরও জানান, রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের তীব্র যত্ন প্রদান করা হচ্ছে।
পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক নুরুল আলম জানান, গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে গুলির ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, গুলি মিয়ানমার থেকে ক্রস-বর্ডার শ্যুটিংয়ের ফল, যা গতকাল সকাল ৯টায় টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় ঘটেছে। গুলিবিদ্ধ শিশুটি তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, এবং তার শারীরিক ক্ষতি তীব্র হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাসের মতে, প্রথমে শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা সঠিক নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণাধীন। গুলিবিদ্ধ শিশুর মৃত্যুর গুজবের ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় প্রতিবাদ করে, কিছু অংশে সড়ক অবরোধের পরিস্থিতি দেখা যায়।
রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ, মর্টার শেল ও বোমা বিস্ফোরণ অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমার সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) এর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা হুমকি বাড়ছে। বিশেষ করে মংডু টাউনশিপের আশেপাশে তিন দিন ধরে এএ অবস্থানে বিমান হামলা তীব্র হয়েছে, যা সরকারি জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনার ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি বিশ্লেষক রবার্ট হ্যানসেন উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের সীমান্তে ক্রমবর্ধমান ক্রস-বর্ডার শ্যুটিং শুধুমাত্র মানবিক সংকট নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে।” তিনি যুক্তি দেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয়েরই এই ধরনের ঘটনা রোধে দ্রুত কূটনৈতিক সংলাপ চালু করা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রাখাইন অঞ্চলের অবস্থা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকার উভয়েরই বেসামরিক নাগরিকের ওপর আক্রমণ বন্ধ করা উচিত, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।” সংস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকারকে মানবিক সহায়তা প্রবাহে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রাখাইন সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে বলে জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, “সীমান্তে ঘটিত এই ধরনের ঘটনা আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের সরাসরি প্রভাব ফেলে, তাই আমরা দু’দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”
স্থানীয় প্রশাসন গুলিবিদ্ধ শিশুর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি, সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট শরণার্থী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনা রাখাইন সীমান্তে চলমান সংঘর্ষের মানবিক পরিণতি তুলে ধরেছে এবং বাংলাদেশকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে কূটনৈতিক ও মানবিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। ভবিষ্যতে গুলিবিদ্ধ শিশুর স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য উভয় দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



